গাজীপুরের বিভিন্ন বস্তিতে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে কয়েকজন নারীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। টঙ্গীর হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক ও এরশাদ নগরসহ বিভিন্ন বস্তিতে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে কয়েকজন নারীর বিরুদ্ধে। তাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন আরও অনেক নারী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির মোমেলা বেগম, ময়না খাতুন ও আফরিনা আক্তার এবং কেরানীরটেক বস্তির কুলসুম ও কারিমা বেগমকে স্থানীয়ভাবে বড় মাদক কারবারি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। টঙ্গীর বাইরে গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুরের ডালিয়া বেগম এবং লক্ষ্মীপুরা এলাকার তাহমিনা ও আশার বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে।
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির মোমেলা বেগম (৪৬) বড় পাইকারি মাদক কারবারিদের একজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গাঁজা দিয়ে কারবার শুরু করার পর তিনি ফেনসিডিল, হেরোইন এবং পরে ইয়াবার ব্যবসায় যুক্ত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
টেকনাফ থেকে ইয়াবা আনার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ১৯টি মাদক মামলা রয়েছে। গত বছরের ২ নভেম্বর ৪০০ ইয়াবা ও ৪০ গ্রাম হেরোইনসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রতিবেদনে মোমেলা বেগমের নামে ও বেনামে টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বাড়ি ও সম্পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্বামী জাহাঙ্গীর আলমের জন্য চারটি মিনিট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশা এবং মেয়েজামাইয়ের জন্য একটি ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার কথাও বলা হয়েছে।
ব্যাংক মাঠ বস্তির ময়না খাতুন (৫৫) মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে এক ডজন মামলা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর মেয়ে নার্গিস ও পুত্রবধূ রোজীর নামও শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকায় রয়েছে।
ময়নার ভাই শফিকুল ইসলাম টেকনাফ থেকে ইয়াবা আনার সময় কক্সবাজার পুলিশের হাতে ছয় হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে জামিনে বেরিয়ে তিনি আবার যাত্রাবাড়ী এলাকায় ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন।
ময়নার কাছ থেকে পাইকারি মাদক নিয়ে খুচরা বিক্রি করেন রানী ও তাঁর ছেলে রাব্বানি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ময়নার ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুর বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। মাদক কারবারের অর্থে ময়না ও তাজুল গাজীপুর ও মাদারীপুরে সম্পদ গড়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে আফরিনা আক্তারের (৪০) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এলাকায় তিনি ‘বড় আপা’ নামে পরিচিত। তাঁর স্বামী জামাল হোসেন ও ভাই শ্রাবণ মাদক কারবারে সহযোগিতা করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
একসময় ফেনসিডিলের বড় পাইকারি কারবারি থাকলেও বর্তমানে তিনি ইয়াবা বিক্রি করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টঙ্গীর কেরানীরটেক বস্তির কুলসুম (৩৫) মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত একটি বড় চক্র পরিচালনা করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। রেলওয়ের সরকারি জায়গা দখল করে তাঁর বাহিনী মাদক কারবারের স্পট তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
গত জুলাইয়ে কুলসুমের বোন নার্গিসকে আট কেজি গাঁজাসহ টঙ্গী পূর্ব থানার পুলিশ আটক করে। কুলসুমের বোনের ছেলে রাকিব তাঁর মাদক কারবারের অন্যতম সহযোগী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই বস্তির কারিমা বেগমের (৩৫) বিরুদ্ধেও এক ডজন মাদক মামলা রয়েছে। গত ১৮ জুলাই তাঁকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিনের মাদক কারবারের মাধ্যমে তিনি একাধিক বহুতল ভবনসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর নয়াপাড়ার কাঁঠালতলা মহল্লার ডালিয়া (৩৮) ছয়-সাত বছর আগেও অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্বামী ওয়াশিম রিকশাভ্যান চালাতেন।
বর্তমানে ওই এলাকায় তাঁদের পাঁচটি বাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছয়তলা এবং অন্যগুলো টিনশেড ভবন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, মহানগরের বিভিন্ন বস্তিতে ছোট-বড় মাদক কারবার চলে। এসব বন্ধে গত আট মাসে অসংখ্য অভিযান চালানো হয়েছে এবং বিপুল মাদকসহ অনেক কারবারিকে আটক করা হয়েছে।
তিনি জানান, কিছুদিন আগে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি গত সোমবার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সহায়তায় বস্তির মাদকের আস্তানাগুলো উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে।
টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে পর্যায়ক্রমে সব বস্তিতে অভিযান চালানো হবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
