মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা সদরের দক্ষিণ জাঙ্গিরাই এলাকায় কয়েক বছর আগেও পড়ে ছিল জমি। সেই পতিত জমিতে এখন সারা বছরই চাষ হচ্ছে নানা ধরনের সবজি। ব্যবসার পাশাপাশি এই সবজি চাষ করে বাড়তি আয় করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল মতিন (৩৫)।
২০২২ সালে পরিবারের প্রায় ২০ শতক জমির পাশাপাশি অন্য মালিকের আরও ৬০ শতক পতিত জমি ইজারা নিয়ে সবজি চাষ শুরু করেন মতিন। বছরে ২৫ হাজার টাকায় জমিটি ইজারা নেওয়ার পর উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও উৎসাহে চাষাবাদ শুরু করেন তিনি।
প্রথম বছর মতিন স্থানীয় কৃষক তাজুল ইসলামের (৪০) সহযোগিতায় পুরো জমিতে টমেটো, ধনেপাতা, কাঁচা মরিচ ও বেগুন চাষ করেন। জমি প্রস্তুত, বীজ, চারা, সার, সেচ, বাঁশের খুঁটি ও বেড়া তৈরিতে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। পরে সবজি বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা লাভ করেন তাঁরা।
২০২৩ সাল থেকে নিজেই সবজি চাষের দায়িত্ব নেন মতিন। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর তিনি জমিতে যান। সকাল নয়টা থেকে সাড়ে নয়টার দিকে বাড়ি ফিরে নাশতা করে দোকানে চলে যান। বাগানের পরিচর্যার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা বেতনে একজন শ্রমিকও রেখেছেন তিনি।
শুরুতে সরাসরি মাটিতে সবজি চাষ করলেও বৃষ্টির সময় মাটি সরে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হতো। পরে চাষপদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে মালচিং পেপার ও পলিশেড ব্যবহার শুরু করেন। এতে খরচ বেড়েছে বলে জানান মতিন। বর্তমানে প্রতি মৌসুমে তাঁর প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়।
গ্রীষ্মকালে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে টমেটো চাষের পাশাপাশি তরমুজ, শসা, লাউ ও করলা চাষ করেন তিনি। শীতকালে চাষ করেন লাউ, টমেটো ও আলু।
গত বুধবার সকালে দক্ষিণ জাঙ্গিরাই এলাকায় মতিনের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে গাছ থেকে সবজি সংগ্রহ করছেন তিনি। প্রায় ৩০ শতক জমিতে টমেটো, ২০ শতকে লাউ, ১৫ শতকে শসা এবং ১৫ শতকে হলুদ তরমুজ চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ শতক জমিতে স্থানীয় কৃষি বিভাগ গ্রাফটিং টমেটোর প্রদর্শনী দিয়েছে।
মতিন জানান, বাগানে জৈব সারই বেশি ব্যবহার করেন। কীটনাশক তেমন ব্যবহার করতে হয় না। টমেটো, লাউ ও শসা সাধারণত শীতকালীন সবজি হলেও গ্রীষ্মে এসব সবজির চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় এ সময়ও এগুলো চাষ করছেন তিনি।
বর্তমানে তাঁর বাগানের টমেটো প্রতি কেজি ১১০ টাকা, শসা ৩৫ টাকা এবং লাউ আকারভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হলুদ তরমুজ এখনো পরিপক্ব হয়নি। মতিনের হিসাব অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকার সবজি বিক্রি হয়েছে। শীত আসার আগপর্যন্ত আরও আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার সবজি বিক্রির আশা করছেন তিনি।
মতিনের ভাষ্য, পতিত জমিকে কাজে লাগানোর পর এখন সারা বছরই তাঁর খেতে সবজি থাকে। নিজের পরিবারের পাশাপাশি দুই ভাইয়ের পরিবারেও তিনি সবজি দেন। স্থানীয় কিছু পাইকার তাঁর কাছ থেকে সবজি কেনেন। আবার নিজের দোকানের সামনেও কিছু সবজি রাখেন, সেখান থেকে স্থানীয় লোকজন এক-দুই কেজি করে কিনে নেন।
সবজি চাষের পাশাপাশি বাড়ির কাছে নিজেদের দুই বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ও পেয়ারা লাগিয়েছেন মতিন। এভাবে ধীরে ধীরে কৃষিকাজের পরিধিও বাড়িয়েছেন তিনি।
জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান বলেন, শ্রম, সময় ও সঠিক পরিচর্যা থাকলে জমিতে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব—মতিনের উদ্যোগ তার উদাহরণ। তাঁর সবজির বাগান অন্য কৃষকদেরও উৎসাহিত করছে।
কৃষি কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় কৃষকদের শাকসবজি চাষে উৎসাহিত করতে গত ২৪ আগস্ট মতিনের বাগানে দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। প্রশিক্ষণে মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন এবং বাগান ঘুরে মতিনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
পতিত পড়ে থাকা জমিতে সবজি চাষ শুরু করে এখন ব্যবসার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছেন আবদুল মতিন। তাঁর বাগানে একদিকে যেমন সারা বছর সবজি উৎপাদন হচ্ছে, অন্যদিকে সেখানে একজনের কর্মসংস্থানও হয়েছে।
