ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে মাদারীপুরের এক যুবককে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে একটি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে। ছেলেকে মুক্ত করতে পরিবারের পক্ষ থেকে দালালদের প্রায় ৩১ লাখ টাকা দেওয়া হলেও তাকে ফেরানো সম্ভব হয়নি। এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটছে বৃদ্ধা মা কুট্টি বিবির।
অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শুক্রবার বিকেলে মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের মঠেরবার এলাকায় মানববন্ধন করেছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরিবারের দাবি, সদর উপজেলার চরগোবিন্দপুর এলাকার মৃত করিম সরদারের ছেলে দেলোয়ার সরদার, তার স্ত্রী সোহাগী বেগম এবং দালাল সুমন সরদার ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে মাসুম আকন (২৫) নামের ওই যুবককে বৈধ স্পন্সর ভিসায় ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন মাসুম। পরদিন দালালরা তার পরিবারকে জানান, তিনি ইতালিতে পৌঁছে গেছেন।
তবে প্রায় ১০ দিন পর ইমো অ্যাপের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মাসুম। তখন তিনি জানান, তাকে ইতালিতে নেওয়া হয়নি। সৌদি আরব ও মিসর হয়ে তাকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছে।
এরপর মাসুমকে মুক্ত করার কথা বলে পরিবারের কাছে আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ছেলেকে বাঁচানোর আশায় পরিবার আরও ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা দেয়। সব মিলিয়ে দালালদের হাতে দেওয়া হয় ৩০ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
পরিবারের অভিযোগ, এত টাকা দেওয়ার পরও মাসুমকে মুক্ত করা হয়নি। বরং আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ওই টাকা দিতে অপারগতা জানালে লিবিয়ায় মাসুমের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
একপর্যায়ে দালাল চক্রের নির্দেশে মাসুমকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
মাসুমের পরিবারের দাবি, হত্যার খবর পাওয়ার পর তারা অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে টাকা ও ছেলের মরদেহ ফেরত চান। এ সময় তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
পরে মাদারীপুরের বিজ্ঞ মানবপাচার ট্রাইব্যুনাল আদালতে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
মামলার আসামিরা হলেন—সুমন সরদার, দেলোয়ার সরদার, সোহাগী বেগম, সিমু আক্তার ও শফিকুল ইসলাম।
মানববন্ধনে নিহত মাসুমের বড় ভাই মামুন আকন বলেন, ভাইকে বাঁচানোর জন্য ধার-দেনা ও সুদে টাকা এনে দালালদের দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মামুন আকন অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে দ্রুত তার ভাইয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে দাফনের ব্যবস্থা করতে সরকারের সহযোগিতা চান।
মানববন্ধনে নিহতের মা কুট্টি বিবি, বড় ভাই মামুন আকন, আজিজুল আকনসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে খোয়াজপুর ইউনিয়নের শত শত সাধারণ মানুষও এতে অংশ নেন।
পরিবারের দাবি, প্রায় ৩১ লাখ টাকা হারানোর পাশাপাশি তারা হারিয়েছে পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। এখন তাদের প্রধান দাবি, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া এবং লিবিয়ায় নিহত মাসুমের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে তার মায়ের কাছে তুলে দেওয়া।
