ভারতের মহারাষ্ট্রের জলগাঁও জেলায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩৮৩ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ২৯ জনের আত্মহত্যার ঘটনায় বিয়ের জন্য পাত্রী না পাওয়ার বিষয়টি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে মাদকাসক্তি, হতাশা, পারিবারিক সমস্যা ও ঋণের মতো বিভিন্ন কারণও উঠে এসেছে।
তবে ২৯টি ঘটনায় বিয়ের জন্য পাত্রী না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর জলগাঁওয়ে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এসব আত্মহত্যার পেছনে শুধু বিয়ে করতে না পারাই দায়ী ছিল কি না, নাকি এর সঙ্গে আরও জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা যুক্ত রয়েছে।
জলগাঁওয়ের বিভিন্ন গ্রামে তরুণ, তাদের পরিবার, নারী এবং বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনে বিয়ে নিয়ে পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
জলগাঁওয়ের ৩০ বছর বয়সী অধ্যাপক বিশাল পাতিল জানান, তার বাবা-মাও চান তিনি বিয়ে করুন। তবে তিনি বর্তমানে ক্যারিয়ারে মনোযোগ দিতে এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চান। নিজের জন্য উপযুক্ত ও তাকে বুঝতে পারবেন—এমন একজন নারীকে পাওয়ার পরই তিনি বিয়ে করতে চান।
বিশাল পাতিলের মতে, ভারতীয় সমাজে বিয়ের একটি নির্দিষ্ট বয়স নিয়ে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। সাধারণত ২৪ থেকে ২৬ বছর বা সর্বোচ্চ ২৮-২৯ বছরের মধ্যে বিয়ে হয়ে যাওয়া উচিত বলে মনে করা হয়।
তার ভাষ্য, কেউ ৩০ বছর পার করলে শুধু অবিবাহিত থাকার কারণেই সমাজের একাংশ তার মধ্যে কোনো সমস্যা রয়েছে বলে মনে করতে শুরু করতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাউন্সেলিং করা মুকেশের ব্যাখ্যা, বিয়েকে যখন সামাজিক মর্যাদা ও সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন অনেক অবিবাহিত তরুণ বিয়ে না হওয়াকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
তবে জলগাঁও পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধু বিয়ে না হওয়াকে আত্মহত্যার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। পুলিশের পরিসংখ্যানে মাদকাসক্তি, হতাশা, পারিবারিক চাপ ও ঋণের মতো অন্যান্য কারণও উঠে এসেছে।
২০১৯ থেকে ২০২১ সালের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-৫-এর তথ্য অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রায় ১১ শতাংশ নারী অবিবাহিত। একই বয়সসীমার পুরুষদের মধ্যে অবিবাহিতের হার প্রায় ৩০ শতাংশ।
অর্থাৎ একই বয়সসীমায় মহারাষ্ট্রে অবিবাহিত পুরুষের হার নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবে এর পেছনে শুধু নারীর সংখ্যা কম থাকাই কারণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জলগাঁওয়ের কৌস্তুভ পোটদারের ঘটনাও এ ক্ষেত্রে একটি দিক তুলে ধরে। বি ফার্ম ডিগ্রি শেষ করে নাসিকের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। মায়ের মৃত্যুর পর পরিবার তার জন্য পাত্রী খুঁজতে শুরু করে।
কিন্তু নিজের বাড়ি বা সরকারি চাকরি না থাকায় বিভিন্ন পাত্রীপক্ষের কাছ থেকে তাকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হতে হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মহত্যা করেন কৌস্তুভ।
তবে তার ঘটনাকে সব প্রত্যাখ্যাত বিয়ের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সাধারণ উদাহরণ হিসেবে দেখা যায় না। এটি কেবল দেখায় যে বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও পারিবারিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জলগাঁওয়ের এক প্রবীণ নারী জানান, তার ছেলের বয়স ৪০ বছর। বহু বছর ধরে ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজছেন তিনি। বিভিন্ন পাত্রীপক্ষের কাছ থেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর এখন ছেলের জন্য একটি পাকা বাড়ি তৈরি করছেন। তার আশা, বাড়ি তৈরি হলে ছেলের জন্য পাত্রী পাওয়া সহজ হবে।
মহারাষ্ট্রের গ্রামাঞ্চল নিয়ে গবেষণা করেছেন ময়ূর কুডুপলে ও জোয়েল কাবালিয়ান। তাদের গবেষণাতেও বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ময়ূর কুডুপলের মতে, একসময় গ্রামে পাত্রের কত জমি রয়েছে, সেটি বিয়ের ক্ষেত্রে বড় বিবেচনার বিষয় ছিল। এখন জমির চেয়ে পাত্রের চাকরি আছে কি না, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার ধারণাও বদলেছে। আগে জমিকে আর্থিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। এখন নিয়মিত আয়, চাকরি, শহরে থাকার সুযোগ ও নিজস্ব বাড়ির মতো বিষয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি জাতি ও উপজাতির মতো বিষয়ও বিয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
ময়ূর কুডুপলের মতে, অনেক পরিবার এখনো নিজেদের জাতি ও উপজাতির মধ্যেই পাত্র-পাত্রীর খোঁজ করে। ফলে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার পরিধি সীমিত থাকে।
লিঙ্গ সমতা প্রশিক্ষক দর্শনা পাওয়ার বলেন, কোনো পুরুষ অন্য জাতির নারীকে বিয়ে করতে রাজি হলেও পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়রা সেই বিয়ে মেনে নেবেন কি না, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
জলগাঁওয়ের কিছু পুরুষের অভিযোগ, বিয়ে নিয়ে নারীদের প্রত্যাশা বেড়েছে। তাদের ধারণা, নারীরা চাকরি, শহরে বাড়ি ও আর্থিকভাবে স্থিতিশীল পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চান।
তবে নারীদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন বাস্তবতাও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ২০ থেকে ২২ বছর বয়সী এক তরুণীর সঙ্গে বিয়ে ও ব্যক্তিগত প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলা হলেও পরে তার পরিবার জানায়, ওই বক্তব্য প্রতিবেদনে ব্যবহার করা যাবে না।
দর্শনা পাওয়ারের মতে, স্বামীর সঙ্গে কথা বলা বা একসঙ্গে সময় কাটানোর প্রত্যাশা অস্বাভাবিক নয়। এগুলো একজন নারীর মৌলিক ও যুক্তিসঙ্গত আকাঙ্ক্ষা।
তার মতে, এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। তবে জলগাঁওয়ে কথা বলা বেশির ভাগ পুরুষই বিয়ে না হওয়ার জন্য নারীদের দায়ী করেছেন।
গবেষণাতেও দেখা গেছে, নারীদের পছন্দের পরিবর্তনকে শুধু প্রত্যাশা বেড়ে যাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখা যায় না। কৃষিকাজ কমে যাওয়া, বেকারত্ব, শিক্ষার প্রসার, জাতি ও সামাজিক অবস্থানের মতো বিভিন্ন কারণও এর সঙ্গে যুক্ত।
জলগাঁওয়ের বিভিন্ন গ্রামে বিয়ে নিয়ে কথা বলার সময় অনেক পুরুষকে নিজেদের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ হতে দেখা গেছে। কেউ কেউ ক্যামেরার সামনে কথা বলতেও রাজি হননি।
একজন যুবকের ভাষ্য ছিল, ক্যামেরার সামনে নিজের কথা বললে ভবিষ্যতে কে তাকে বিয়ে করবে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
বহু পরিবার বছরের পর বছর চেষ্টা করেও পাত্রী না পাওয়ায় এখন ছেলেদের বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। আবার কেউ কেউ পরিস্থিতি বদলানোর আশায় বাড়ি তৈরি করছেন, জমি কিনছেন কিংবা ছেলের আর্থিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করছেন।
অনেক পরিবার পাত্রী খুঁজতে ঘটকের সাহায্য নিচ্ছে। কিছু অভিভাবক আবার বিয়ের ব্যবস্থা করার নামে প্রতারণার অভিযোগও করেছেন।
জীবনসঙ্গী খুঁজতে কিছু পুরুষ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলেও যাচ্ছেন। এমনকি পাত্রী পাওয়ার জন্য কিছু পরিবার অর্থ দিতেও রাজি হচ্ছে। ফলে পাত্র-পাত্রীর খোঁজ এখন আত্মীয়স্বজনের প্রচলিত গণ্ডি ছাড়িয়ে মধ্যস্বত্বভোগী, অর্থের লেনদেন এবং দূরের এলাকায় গিয়ে পাত্রী খোঁজার মতো নানা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
লিঙ্গ সমতা প্রশিক্ষক দর্শনা পাওয়ারের মতে, কয়েক দশক ধরে চলা কন্যাভ্রূণ হত্যার প্রভাব এখন বিবাহযোগ্য বয়সী পুরুষদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
তার মতে, বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যেসব পুরুষ জীবনসঙ্গী খুঁজে পাচ্ছেন না, তাদের অনেকেই এমন সময়ে জন্মেছেন যখন বিপুলসংখ্যক কন্যাভ্রূণ নষ্ট করা হয়েছে।
তবে নারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে নারীরা বিয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা পেয়েছেন। গবেষণায় দেখা যায়, নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কিছুটা বাড়লেও পারিবারিক প্রত্যাশা, জাতি ও সামাজিক কাঠামোর মতো বিষয় এখনো তাদের ওপর প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে চাকরি, আয়, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক প্রত্যাশা ও বিয়ে নিয়ে পরিবর্তিত ধারণার মধ্যে পুরুষেরাও নিজেদের অবস্থান খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সব মিলিয়ে জলগাঁওয়ের পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বিয়ের সংকটকে শুধু ‘পাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না’—এই একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে জনসংখ্যার ভারসাম্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, চাকরি, জমি, জাতি, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং নারী-পুরুষের বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গির মতো একাধিক বিষয় জড়িত।
অধ্যাপক বিশাল পাতিলের ভাষায়, ‘বিয়েই জীবনের সবকিছু নয়।’
