যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসের বেশি সময়ে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার দরপতন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি সামাজিক নিয়ন্ত্রণও বেড়েছে। ফলে প্রায় ৯ কোটি ইরানির কাছে দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে যুগান্তর জানিয়েছে, যুদ্ধের পরিস্থিতির সঙ্গে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানিয়ে নিলেও নিজেদের আদর্শগত অবস্থান থেকে বড় কোনো ছাড় দেয়নি। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হন।
এরপরও ইরানের সরকার টিকে থাকে। প্রয়াত নেতার ছেলে মোজতাবা খামেনি দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। একই সময়ে সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কমান্ডারও পরিবর্তন করা হয়।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নাকি কূটনৈতিক সমাধানের পথে যাওয়া—এ নিয়ে ইরানের ক্ষমতাসীন মহলে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে উভয় পক্ষই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছে আত্মসমর্পণ না করার বিষয়ে একমত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি সমঝোতার দাবি করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ সমঝোতার বিরোধিতা করছে। ওয়াশিংটন চায় গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি পুরোপুরি ও কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই উন্মুক্ত থাকুক।
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের প্রভাব যুক্ত হয়ে ইরানের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২২ আগস্ট শেষ হওয়া মর্দাদ মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৯ শতাংশ বেশি ছিল। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে ১২৭ শতাংশ।
তেহরানের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ডেটা অ্যানালিস্ট বিজান জানান, প্রায় তিন বছর আগে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় তার মাসিক বেতন ১ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের সমান ছিল। তিনবার বেতন বাড়লেও এখন সেই বেতনের প্রকৃত মূল্য ৫০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
রিয়ালের দরপতনও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। শনিবার তেহরানের খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম ২০ লাখ ৬০ হাজার রিয়ালে পৌঁছায়, যা ইরানি মুদ্রার ইতিহাসে সর্বনিম্ন মূল্য।
যুদ্ধের সময়ে ইরানের তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল ও ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎ অবকাঠামোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়িঘর, বন্দর, বিমানবন্দর ও সেতুও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরান এখন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। শীত মৌসুম সামনে রেখে গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য জ্বালানি বরাদ্দ ইতোমধ্যে কমানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পেট্রলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সরকার ‘পবিত্র ঐক্য’ বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের বয়ানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের বিরুদ্ধে বিচার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভিযান জোরদার হয়েছে।
মোজতাবা খামেনির নামে প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় সামাজিক সংহতির ক্ষতি করে—এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এক সাক্ষাৎকারে সরকারের ভয়াবহ আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতি করা তো দূরের কথা, সরকার তেল বিক্রি করতেও সমস্যায় পড়ছে।
এদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণাও নিয়মিত আসছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে।
বাধ্যতামূলক হিজাব আইন প্রয়োগেও আবারও কঠোরতা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামি আইন ও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা না মানার অভিযোগে কয়েকটি ক্যাফে, আইসক্রিমের দোকান ও ব্যক্তিগত অনলাইন বিক্রেতার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তেহরানের তরুণী মারজান বলেন, তিনি এমন একটি জীবন চান যেখানে প্রতিনিয়ত সংঘাত, বিশ্বের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা কিংবা পরের দিন কীভাবে বেঁচে থাকবেন—এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। তবে সেই জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় তিনি হতাশ।
আরেক তরুণ বাসিন্দা সাসান বলেন, দেশের ওপর বাইরের চাপ বাড়লেই কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে।
যুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিণতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন যে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে, তাদের বক্তব্যে সেই বাস্তবতাই উঠে এসেছে।
