পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় দক্ষতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, বিদেশি নির্ভরতা কমার আশা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন ১ হাজার ৩৩৬ জন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ। রাশিয়ার সহযোগিতায় পরিচালিত এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের নিজস্ব মানবসম্পদকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা রাশিয়ান ফেডারেশন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রশিক্ষণ সুবিধা ব্যবহার করে বিশেষায়িত কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
মন্ত্রী জানান, রূপপুর প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও ফুল-স্কেল সিমুলেটর সমৃদ্ধ এই কেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার বাস্তবধর্মী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মতো জটিল প্রযুক্তিনির্ভর খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশি কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের একটি অংশ রাশিয়ায় বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। দেশে ফিরে তারা রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের জনবলকে প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদান করছেন।
বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীদের সক্ষমতা বাড়াতে এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ কর্মী কাজ করছেন। তবে প্রশিক্ষিত দেশীয় জনবল বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে বিদেশি প্রযুক্তিবিদদের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি সফল পরিচালনার জন্য নিজস্ব দক্ষ জনবল গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে পরিচালন ব্যয় কমার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়ে।
দেশে পারমাণবিক প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন আরও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কারিগরি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং উচ্চপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশি জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি বড় অবদান রাখতে পারে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে প্রশিক্ষিত দেশীয় বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের সংখ্যা বৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠার মাধ্যমে ভবিষ্যতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে দেশের আত্মনির্ভরতা আরও সুদৃঢ় হবে।
