রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাঁর শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি উল্লেখ করা হতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে সরকার ও ক্ষমতাসীন বিএনপির উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে ইতোমধ্যে বার্তা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অবগত একটি সূত্র বুধবার রাতে জানান, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাবনা খুবই জোরালো।
বঙ্গভবন-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি অধস্তন কর্মকর্তাদের কাছে শিগগিরই বঙ্গভবন ত্যাগ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পদত্যাগের পর তিনি কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসার জন্য বিদেশেও যেতে পারেন।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালনকারী এক সচিবের নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে সামনে এসেছে। এর আগে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খানসহ আরও কয়েকজনের নাম আলোচনায় ছিল।
তবে এ বিষয়ে নিজের নাম আলোচনায় থাকার প্রসঙ্গে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “এ বিষয়ে আমি একেবারেই অবগত নই। আর এমন কিছু ঘটলে (রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ) শূন্য পদে অনেক নামই আলোচিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।”
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে এখনো বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি অসুস্থতা, অনুপস্থিতি কিংবা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, নতুন রাষ্ট্রপতিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে। পাশাপাশি সরকার, বিরোধী দল ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থার কারণে একজন চুক্তিভিত্তিক সচিবের নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এসেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আরও আলোচনা হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করলে সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন তাঁর অপসারণের দাবি জানিয়ে কর্মসূচি পালন করেছিল। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে অপসারণে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। যদিও সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ছিল, সরকার বা বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বর্তমান মেয়াদ অনুযায়ী তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিল মাসে।
তবে সাম্প্রতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি পদত্যাগ করলে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন নেতৃত্ব আসবে। একই সঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো বিএনপি নিজেদের মনোনীত একজনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার সুযোগ পাবে, যা আগামী জাতীয় নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
