বিএফআইইউর প্রতিবেদন: এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ
বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক
দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে ‘এস গ্রুপ’ নামে উল্লেখ করা একটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ‘এস গ্রুপ’ নামটি এস আলম গ্রুপকে নির্দেশ করছে।
বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাব এবং একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় গ্রুপটি সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের বসানো হয় এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে মোট ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে। এর মধ্যে ৯০ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে ৪৩টি সরাসরি প্রতিষ্ঠানের নামে এবং ৯৮ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বাকি ৩৭ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে অন্যান্য উপায়ে।
বিএফআইইউর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত ছিল না। মোট ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের বাজারমূল্য ছিল মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকা। সংস্থাটি এটিকে দেশের ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর গ্রুপটি বৈধ ব্যবসার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শেল বা কাল্পনিক কোম্পানি গঠন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই অনুসরণ করা হয়নি। এর মাধ্যমে ব্যাংকের তহবিল ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিএফআইইউ জানিয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থ জটিল মানি লন্ডারিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, পাচার করা অর্থের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাইপ্রাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিথিল আর্থিক তদারকির জন্য পরিচিত কয়েকটি অফশোর অঞ্চলের সঙ্গেও গ্রুপটির সংযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিএফআইইউ আরও উল্লেখ করেছে, গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রধান ব্যক্তিরা তিনটি ভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। এতে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত এক নজিরবিহীন ও পদ্ধতিগত ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ, নিয়ন্ত্রক আইন লঙ্ঘন, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি বিস্তৃত আর্থিক অনিয়মের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে গত শনিবার এস আলম গ্রুপের কাছে ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।
