ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর বনাঞ্চলের ৫৬৫ একর বনভূমিকে ইকোপার্ক ঘোষণা করেছে সরকার। এতে ক্ষয়িষ্ণু শালবন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও সামাজিক বনায়নের অংশীদার ও বনভূমিতে চাষাবাদ করা স্থানীয় মানুষের মধ্যে জীবিকা এবং উচ্ছেদ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
৩ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী সন্তোষপুর মৌজার ওই বনভূমিকে ইকোপার্ক ঘোষণা করা হয়। বৃক্ষসম্পদ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জনসাধারণের বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করাই এ ঘোষণার উদ্দেশ্য।
ফুলবাড়িয়ার নাওগাঁও ইউনিয়নের সন্তোষপুর, কৃষ্ণপুর ও রাঙ্গামাটিয়া—এই তিন মৌজায় মোট বনভূমির পরিমাণ ৩ হাজার ৬৫৯ দশমিক ১৪ একর। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা শাল ও গজারির প্রাকৃতিক বনে আচ্ছাদিত ছিল। বুনো শূকর, মেছো বাঘ, হনুমানসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীরও বিচরণ ছিল সেখানে।
কালের পরিক্রমায় বনভূমির পরিমাণ কমে এসেছে। বর্তমানে প্রাকৃতিক শালবন রয়েছে মাত্র প্রায় ৫০ একর। অন্যান্য এলাকায় বন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি ও সামাজিক বনায়ন করা হয়েছে।
রাবারবাগানের জন্য প্রায় ১ হাজার ৩৬১ একর জমি বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে রাবারবাগান রয়েছে প্রায় ৭০০ একর এলাকায়। সুফল প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৭০০ একর জমিতে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছের বাগান করা হয়েছে। প্রায় ৪০ একর এলাকায় রয়েছে আগরবাগান। অবশিষ্ট অংশে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বনায়ন রয়েছে।
বন বিভাগ জানায়, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে কৃষি বনায়ন এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম শুরু হয়। এসব কার্যক্রমে স্থানীয় মানুষকে অংশীদার করা হয়। সামাজিক বনায়নের বড় অংশে আকাশমণিগাছ লাগানো হয়েছে। সন্তোষপুর বিটের ডেপুটি রেঞ্জার ও বিট কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, প্রাকৃতিক বনে শালগাছ বা শালের চারা থাকলে সেখানে নতুন বাগান করা হয়নি। আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত বা দখল হয়ে যাওয়া এলাকায় পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে বনায়ন করা হয়েছে।
বন বিভাগের হিসাবে, একসময় সন্তোষপুরে প্রায় ১৫০ একর বনভূমি জবরদখলে ছিল। গত দুই বছরে ১১২ একর জমি দখলমুক্ত করে সেখানে সামাজিক বনায়ন করা হয়েছে। গাছ কাটা ও বনভূমি দখলের অভিযোগে ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে চলতি আগস্ট পর্যন্ত ৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত দুই বছরেই হয়েছে ৩৪টি মামলা।
ইকোপার্ক ঘোষণার পর সামাজিক বনায়নের অংশীদার এবং বনাঞ্চলের ভেতরে বসবাস ও চাষাবাদ করা স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন করে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। কেউ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক বনায়নের আওতায় থাকা জমিতে কৃষিকাজ করছেন, আবার কেউ বনভূমির ভেতরেই বসবাস করছেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সন্তোষপুর বনাঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমে প্রায় দেড় হাজার মানুষ অংশীদার হিসেবে যুক্ত।
স্থানীয় কৃষক সুলেমান মিয়া বন বিভাগের জমিতে আনারস ও হলুদ চাষ করেন। তিনি বলেন, “৪০ বছর মেয়াদে সরকার আমাদের অংশীদার করেছে। গাছ দেখাশোনার পাশাপাশি বনে চাষাবাদ করে সংসার চালাই। ইকোপার্কের হলে এই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায় কি–না দুশ্চিন্তায় আছি।”
সন্তোষপুরে আনারস, হলুদ, কলা ও লেবুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। এসব পণ্য থেকে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয় বলে দাবি করেছেন ফুলবাড়িয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ। তাঁর মতে, কৃষিকে বিবেচনায় রেখেই ইকোপার্কের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। স্থানীয় কৃষিকে টিকিয়ে রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে মানুষের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে।
সামাজিক বনায়নের অংশীদারদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ নূরুল করিম। তিনি বলেন, “সামাজিক বনায়নে স্থানীয় মানুষকে অংশীদার করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে নিয়েই উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে।”
বন সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলে বন্য প্রাণীর উপস্থিতিও কমেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা গৌরাঙ্গ চন্দ্র বর্মণ বলেন, “বুনো শূকর, শিয়াল, বানর, হনুমান দেখেছি। বাঘ থাকার কথাও শুনেছি। এখন কিছু শিয়াল আর বানর ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না।”
ইকোপার্কে দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ নূরুল করিম। এ জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি তৈরির প্রস্তুতি চলছে।
পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সীমানাপ্রাচীর, প্রধান ফটক, টিকিট কাউন্টার, পার্ক কার্যালয়, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, দর্শনার্থীদের জন্য শেড, বসার বেঞ্চ, তথ্যকেন্দ্র, শৌচাগার, সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও নামাজের স্থান। এ ছাড়া হাঁটার পথ, লেক খনন এবং নৌবিহারের ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসান বলেন, ইকোপার্ক হলে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষই বেশি উপকৃত হবেন। তাঁর ভাষ্য, “স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়েই এবং তাঁদের অধিকার সংরক্ষণ করেই ইকোপার্ক বাস্তবায়ন করা হবে। তাঁদের ক্ষতি হবে—এমন প্রচার সঠিক নয়।”
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) অতিরিক্ত পরিচালক এম এ ফারুকের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। সন্তোষপুরে ইকোপার্ক প্রতিষ্ঠাকে তিনি ভালো উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর পরামর্শ, এটি যেন কেবল পর্যটনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
