বড় আকারের ইলিশ নিয়ে তীরে ফিরছেন জেলেরা। উপকূলে নৌকা ভিড়তেই শুরু হচ্ছে নিলাম, আর স্থানীয় ‘ডাকুয়াদের’ হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠছে পুরো এলাকা। জেলেদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার বেশি পরিমাণ এবং আকারে বড় ইলিশ ধরা পড়ছে, ফলে আয়ও বেড়েছে তাদের।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার দক্ষিণ সলিমপুর উপকূলে গিয়ে দেখা যায়, জোয়ার না থাকায় মাছভর্তি নৌকাগুলো বেড়িবাঁধ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নোঙর করেছে। সেখান থেকে ঝুড়িভর্তি ইলিশ কাঁধে করে জেলেরা বেড়িবাঁধে নিয়ে আসছেন। মাছ তীরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে পাইকার ও স্থানীয় ক্রেতাদের ভিড় জমে যায়।
স্থানীয়ভাবে ‘ডাকুয়া’ নামে পরিচিত ব্যক্তিরা জেলেদের পক্ষে পাইকারদের সঙ্গে দরদাম করেন। তারা প্রথমে একটি প্রাথমিক দর ঘোষণা করে নিলাম শুরু করেন। এরপর সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে মাছ বিক্রি করা হয়। ফলে মাছের বাজারে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
জেলেরা জানান, প্রতিটি ঝুড়িতে সাধারণত ৭ থেকে ১০ কেজি ইলিশ থাকে। মাছের আকারভেদে প্রতি ঝুড়ি পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের ইলিশ থাকলে দাম আরও বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
সন্দ্বীপ চ্যানেলে মাছ ধরা জেলে মুন্না জলদাস জানান, তিনি ২০টি জালে ১৮ কেজি ইলিশ পেয়েছেন এবং তা ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। তার ভাষায়, দুটি ইলিশের ওজন এক কেজিরও বেশি ছিল, আর বেশ কয়েকটি মাছের ওজন ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রাম। যাতায়াত ও শ্রমিক খরচ বাদ দিয়েও একদিনে প্রায় ১২ হাজার টাকা লাভ হয়েছে বলে জানান তিনি।
উপকূলীয় এলাকার জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু সলিমপুর নয়, ভাটিয়ারী, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া ও বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নেও গত বছরের তুলনায় বেশি ইলিশ ধরা পড়ছে। বড় আকারের মাছ এবং বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় জেলেরা ভালো দাম পাচ্ছেন।
ডাকুয়া মো. রাসেল বলেন, জেলেরা নিজেরা সরাসরি নিলাম পরিচালনা করতে পারেন না। অনেক সময় পাইকারদের সঙ্গে দরকষাকষিতেও সমস্যায় পড়েন। এ কারণে তারা ডাকুয়াদের সহায়তা নেন। বিনিময়ে প্রতি ঝুড়িতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা কমিশন পান ডাকুয়ারা।
পাইকার জসিম উদ্দিন জানান, এক ঘণ্টার মধ্যেই বেড়িবাঁধ এলাকায় কয়েক লাখ টাকার ইলিশ বিক্রি হয়েছে। তিনি নিজেই প্রায় এক লাখ টাকার মাছ কিনেছেন। এসব মাছ ঢাকার বাজারে সরবরাহ করা হবে বলে জানান তিনি।
জেলেদের ভাষ্যমতে, ইলিশের মৌসুমে জো চলাকালে দিনে চারবার পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরতে যান তারা। গভীর সমুদ্রে মাছের পরিমাণ বেশি পাওয়া গেলেও সেখানে যেতে খরচও বেশি হয়। তবে বর্তমানে ভালো মাছ ও ভালো দাম পাওয়ায় তারা সন্তুষ্ট।
ভাটিয়ারী ইউনিয়নের জেলেদের সর্দার বাদল জলদাস বলেন, মৌসুমের শুরুতেই মাছের উপস্থিতি দেখে পুরো মৌসুমের সম্ভাবনা কিছুটা বোঝা যায়। গত তিন বছর মৌসুমের শুরুতে হতাশ হতে হলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। শুরু থেকেই ভালো পরিমাণ ইলিশ মিলছে এবং আকারও বড়।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোতাছিম বিল্লাহ জানান, গত বছরের জুন মাসে সীতাকুণ্ড এলাকায় ১০ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা পড়েছিল, যা এ বছর বেড়ে ১২ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। এছাড়া গত বছরের পুরো জুলাই মাসে যেখানে ৭৪ দশমিক ২২ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনেই ধরা পড়েছে ৭৬ দশমিক ৬৭ মেট্রিক টন।
তিনি বলেন, জাটকা নিধন রোধে কঠোর নজরদারি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং জেলেদের সচেতন করার উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিয়েছে। তার মতে, মৌসুমের প্রধান সময় এখনও বাকি রয়েছে। ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে সাধারণত সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে গত পাঁচ বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
