সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী সেপ্টেম্বরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে কেন্দ্রটিতে শেষ পর্যায়ের কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। পরীক্ষামূলক সরবরাহ সফল হলে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে ইউনিটটির পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকটের কারণে দেশে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় গ্রিডে এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে দেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এরই মধ্যে প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রবেশ করানো হয়েছে। দুই ধাপে শতাধিক পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলোও ধাপে ধাপে শেষ করা হচ্ছে। প্রতিটি পরীক্ষা যাচাইয়ের পর অনুমোদন দিচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
কেন্দ্রটি চালু হলে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে। একবার জ্বালানি লোড করার পর প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। এরপর নতুন জ্বালানি দেওয়ার জন্য একটি ইউনিট সর্বোচ্চ প্রায় দুই মাস বন্ধ রাখতে হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্য বিদ্যুতের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল ও স্থিতিশীল গ্রিডের মাধ্যমে সরবরাহ করতে হয়। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যে জাতীয় গ্রিড যুক্ত হবে, সেটির সক্ষমতা যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হবে। গ্রিডে যাতে সামান্যতম সমস্যাও না হয় এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনে কোনো বাধা না আসে, সে জন্য পিডিবি, পিজিসিবিসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কাজ করছে সরকার।’
রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের জন্য বাঘাবাড়ী ২৩০ কেভি, বগুড়া ৪০০ কেভি এবং গোপালগঞ্জের আরেকটি ৪০০ কেভি অবকাঠামো ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এরই মধ্যে এসব অবকাঠামোর বেশিরভাগের কমিশনিং শেষ হয়েছে। তবে রূপপুরের পূর্ণ সক্ষমতার বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য আরও প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্রুতগতির বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের সিস্টেম এখনও পুরোপুরি সমন্বয় করার মতো সক্ষম নয়। এই সমন্বয় ঠিকভাবে না হলে যেকোনো সময় দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।’
তিনি বলেন, ‘তাই পিডিবির সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ দেশগুলোর বিশেষজ্ঞ ও বিদেশি পরামর্শক এনে প্রয়োজনীয় আপগ্রেডেশন ও প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
এদিকে রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য এখনও নির্ধারিত হয়নি। পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হলে বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে পৃথক চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের শুরুর দিকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল। তবে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই হিসাবেও পরিবর্তন এসেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশ কিছু পেমেন্ট আটকে আছে। যেহেতু রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর নানা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই এসব লেনদেনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ নির্ধারিত আর্থিক চ্যানেলগুলো ব্যবহার করতে না পারায় এসব অর্থ পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। ফলে রূপপুরের বিভিন্ন কাজ স্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছে কি না, তা নিয়েও এখনও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।’
