প্রায় ১৭ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শ্রম, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে মধ্যপ্রদেশে নির্মিত হয়েছে ভারতের দীর্ঘতম সেচ টানেল। ভিন্ধ্য পর্বতমালার অভ্যন্তর দিয়ে তৈরি ১১ দশমিক ৯৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথের মাধ্যমে নর্মদা নদীর পানি সোন অববাহিকার দিকে প্রবাহিত হবে, তাও কোনো পাম্প ছাড়াই—সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাহায্যে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বার্গি ডাইভারশন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এই টানেলটি মধ্যপ্রদেশের স্লিমনাবাদ অঞ্চলে অবস্থিত। এর ব্যাস ১০ দশমিক ১৪ মিটার। ভিন্ধ্য পর্বতমালার যে অংশ নর্মদা ও সোন নদীর অববাহিকাকে আলাদা করেছে, সেখানেই সবচেয়ে বড় প্রকৌশলগত বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল নির্মাণকাজে জড়িত দলকে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড় কেটে উন্মুক্ত খাল তৈরির পরিবর্তে টানেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কারণ সে ক্ষেত্রে চার কোটির বেশি ঘনমিটার মাটি ও পাথর অপসারণ করতে হতো। পাশাপাশি উচ্চ ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াত।
টানেল নির্মাণের সময় প্রকৌশলীরা নানা ধরনের ভূতাত্ত্বিক সমস্যার মুখোমুখি হন। কোথাও শক্ত মার্বেল ও চুনাপাথর, কোথাও ভঙ্গুর ডলোমাইট, আবার কোথাও নরম মাটি ও ভূগর্ভস্থ ফাঁপা গহ্বর নির্মাণকাজকে জটিল করে তোলে।
অনেক স্থানে প্রতি মিনিটে ১৮ হাজার থেকে ২৫ হাজার লিটার পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানি টানেলের ভেতরে প্রবেশ করত। ফলে সার্বক্ষণিক পাম্প চালিয়ে পানি অপসারণ করতে হয়েছে। এছাড়া ধস, গ্যাস নিঃসরণ, যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি এবং অস্থিতিশীল শিলাস্তরের মতো সমস্যাও নিয়মিত মোকাবিলা করতে হয়েছে।
প্রকল্পে ব্যবহৃত হয় যুক্তরাষ্ট্রের রবিনস এবং জার্মানির এইচকে ব্র্যান্ডের টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম)। পাহাড়ের দুই দিক থেকে একযোগে খননকাজ শুরু করা হয়। একদল প্রকৌশলী ও শ্রমিক উজান দিক থেকে এবং আরেক দল ভাটির দিক থেকে কাজ এগিয়ে নেন।
প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায়। এ সময়ে নতুন প্রজন্ম বড় হয়েছে, বহু শ্রমিক অবসর নিয়েছেন, কেউ কেউ মৃত্যুবরণও করেছেন। তবে কাজ থেমে থাকেনি।
অবশেষে গত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টায় দুই প্রান্তের খননকাজ মিলিত হয়। মাত্র এক মিটার পাথরের দেয়াল ভাঙার পর আলো দেখা যায় অপর প্রান্তে। ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উজান অংশ এবং ৫ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ভাটির অংশ যুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ টানেলটি একক জলপথে পরিণত হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা করতালির মাধ্যমে ঐতিহাসিক মুহূর্তটি উদযাপন করেন। বহু বছর ধরে শুধুমাত্র মানচিত্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে একে অপরের অস্তিত্ব জানা সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হন।
বার্গি ডাইভারশন প্রকল্পের মাধ্যমে জবলপুর, কাটনি, মাইহার, সাতনা, রেওয়া ও পান্না জেলার প্রায় ১ হাজার ৪৫০টি গ্রাম উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছাবে। এর মধ্যে শুধু স্লিমনাবাদ টানেলের কমান্ড এলাকার আওতায় রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর জমি।
জেলা ভিত্তিক সেচ সুবিধার পরিমাণ হলো—
- কাটনি: ২১,৮২৩ হেক্টর
- মাইহার: ৫৪,২২৭ হেক্টর
- সাতনা: ১,০৪,৯৭০ হেক্টর
- রেওয়া: ৩,৫৩২ হেক্টর
- পান্না: ৪৪৮ হেক্টর
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টানেলটি চালু হলে কৃষিক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে। এক ফসলি জমিতে দুই বা তিন ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। ডাল, তৈলবীজ, সবজি ও উদ্যানতাত্ত্বিক চাষ সম্প্রসারিত হতে পারে। পাশাপাশি গবাদিপশু পালন, গ্রামীণ শিল্প এবং স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
এ ছাড়া জবলপুর ও কাটনি অঞ্চলে পানীয় ও শিল্পকারখানার জন্যও পানি সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি টানেল নয়; বরং দীর্ঘদিনের পানির সংকটে থাকা অঞ্চলের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার। ভিন্ধ্য পর্বতের যে প্রাকৃতিক বাধা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দুই অববাহিকাকে আলাদা করে রেখেছিল, আধুনিক প্রকৌশল সেই বাধার ভেতর দিয়েই তৈরি করেছে নতুন জলপথ।
