গাজামুখী ত্রাণবাহী নৌযানে অংশ নেওয়া জার্মান মানবাধিকারকর্মী আনা লিডটকে ইসরায়েলি আটক কেন্দ্রে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, আটক অবস্থায় নারী কারারক্ষীরা তাকে জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতন চালায় এবং এ ঘটনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
২৫ বছর বয়সী আনা লিডটকে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ইউরোপ থেকে গাজার উদ্দেশে রওনা হওয়া একটি ত্রাণবাহী ফ্লোটিলায় অংশ নেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি বাহিনী নৌযানটি আটক করে এবং তাকে ইসরায়েলে নিয়ে গিয়ে পাঁচ দিন আটক রাখা হয়।
লিডটকে বলেন, আটক অবস্থায় তাকে একাধিকবার পোশাক খুলে তল্লাশির মুখোমুখি করা হয়। তার অভিযোগ, তৃতীয়বারের মতো তল্লাশির সময় কয়েকজন নারী কারারক্ষী তাকে জোরপূর্বক হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে, মুখ চেপে ধরে এবং যৌন নির্যাতন চালায়। তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা পুরুষ রক্ষীরা হাসাহাসি করছিল এবং তারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ বা ধারণও করে থাকতে পারে।
গত ডিসেম্বর মাসে তিনি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এই অভিযোগ উত্থাপন করেন। বর্তমানে তার পক্ষে আইনজীবীরা ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল, কারা কর্তৃপক্ষের আইনি উপদেষ্টা, কারারক্ষী তদন্ত বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কারাগারের প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
লিডটকের আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ বলেন, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। তার মতে, বন্দিদের প্রতি নির্যাতনের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, এই মামলা তার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
লিডটকে বলেন, “নীরব থাকলে ভবিষ্যতে অন্যদের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটবে। তাই আমি লজ্জিত নই, বরং সত্য প্রকাশ করাকেই দায়িত্ব মনে করি।”
তিনি দাবি করেন, তার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ফিলিস্তিনি বন্দি ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর একটি ব্যবস্থার অংশ। যদিও তিনি স্বীকার করেন, এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতিসংঘ সম্প্রতি সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে যৌন সহিংসতার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলকে একটি পর্যবেক্ষণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি আটক কেন্দ্রে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে তদন্তও শুরু করেছে।
লিডটকের বর্ণনা অনুযায়ী, নৌযানটি আটক হওয়ার পর তাকে প্রথমে আশদোদ বন্দরে নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে স্থানান্তরের সময় একাধিকবার তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়। তিনি অভিযোগ করেন, এসব তল্লাশি তার সম্মতি ছাড়া এবং পর্যাপ্ত গোপনীয়তা রক্ষা না করেই পরিচালিত হয়েছিল।
আটক থেকে মুক্তি পাওয়ার পর জর্ডানে পৌঁছে চিকিৎসক ও মনোবিদদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। পরে নিজ দেশে ফিরে প্রকাশ্যে অভিযোগ জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। তার দাবি, প্রকাশ্যে কথা বলার পর অন্য কয়েকজন নারীও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তাকে জানিয়েছেন।
তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র জানিয়েছে, আটক অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে আনা নির্যাতনের অভিযোগ তারা প্রত্যাখ্যান করছে। একইভাবে ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস (আইপিএস) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন বা পদ্ধতিগত নির্যাতনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং এসব দাবি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকৃত।
ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
