মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তার জন্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে দেশটির বিভিন্ন স্থানে নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বৃহস্পতিবার জানায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী বান্দার আব্বাসসহ কয়েকটি কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে রাতভর অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ওই এলাকায় ইরানি নৌবাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ডের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রয়েছে। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানকে জবাবদিহির আওতায় আনতেই এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এই হামলায় রাজধানী তেহরানের আশপাশের এলাকাও আক্রান্ত হয়েছে। চলমান সংঘাতের এ পর্যায়ে রাজধানী লক্ষ্য করে এটিই প্রথম হামলার ঘটনা।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে জর্ডানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তাদের আকাশসীমার দিকে ছোড়া অন্তত আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে।
সেন্টকম আরও জানায়, হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও নির্দেশনা অমান্য করায় মার্কিন যুদ্ধবিমান জাহাজটির ধোঁয়া নির্গমন অংশে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে জাহাজটি অচল হয়ে পড়ে।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বান্দার আব্বাস, রাস্ক, চাবাহার, আহভাজ ও সেমনান প্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কেশম, বান্দার ইমাম খোমেনি ও বুশেহর অঞ্চলেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। বুশেহরে ইরানের একমাত্র বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় একটি সেনা ব্যারাকে আঘাত হেনেছে, এতে অন্তত সাত সেনা নিহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের মার্কিন অভিযানে দক্ষিণ ইরানে কমপক্ষে ৩০ জন নিহত ও ২৬০ জন আহত হয়েছেন বলেও দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা ও জ্বালানি সংরক্ষণ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে কামিকাজে ড্রোন ব্যবহার করেছে।
এদিকে তেহরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক থেকে ইরান যদি কোনো বাস্তব সুবিধা না পায়, তাহলে সেটি মেনে চলার কারণ থাকবে না। তিনি যুদ্ধকে সমর্থন না করলেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কূটনীতি ও আলোচনার পথ খোলা রাখার আহ্বান জানান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তেহরানকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে তিনি আগ্রহী নন। তবে ইরানের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “তারা পরিস্থিতি জানে, তাদের ভালো আচরণ করা উচিত।”
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন না বলে তার কার্যালয় জানিয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পিছিয়ে যাওয়ায় সফরসূচিতে পরিবর্তন এসেছে।
অপরদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে জানিয়েছেন, সিরিয়া, লেবানন ও গাজার দখলকৃত ‘নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে’ ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন অব্যাহত থাকবে। বিষয়টি দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ১৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি নির্দেশ করছে।
এদিকে গাজা উপত্যকায়ও হামলা অব্যাহত রয়েছে। গাজার মধ্যাঞ্চলের আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র সামনে এসেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি অভিযানে ১,১২৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩,৬৪৩ জন আহত হয়েছেন।
