কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএম। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অরবিন্দ কৃষ্ণের এ মন্তব্যের পর শেয়ারবাজারে বড় ধাক্কা খেয়েছে কোম্পানিটি। একদিনেই আইবিএমের বাজারমূল্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার কমে যায় এবং শেয়ারের দাম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ও বাজার-তথ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালের পর এটি আইবিএমের ইতিহাসে একদিনে সবচেয়ে বড় শেয়ারমূল্য পতনের ঘটনা। এমনকি ১৯৮৭ সালের শেয়ারবাজার ধসের সময় কোম্পানিটির ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ দরপতনের রেকর্ডও এবার অতিক্রম করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট ও সরকারি খাতে মেইনফ্রেম কম্পিউটার, এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার এবং তথ্যপ্রযুক্তি পরামর্শ সেবা দিয়ে আসছে নিউইয়র্কভিত্তিক আইবিএম। তবে এআই প্রযুক্তির প্রসারের ফলে গ্রাহকদের বিনিয়োগের অগ্রাধিকার বদলে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশিত গতিতে নিজেদের ব্যবসা অভিযোজিত করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন অরবিন্দ কৃষ্ণ।
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান বিশ্বজুড়ে চলমান এআই বিপ্লবের মধ্যে যথেষ্ট দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক চুক্তি প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি। এসব কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) আয়ে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
সিইওর এ মন্তব্যের পরপরই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার ও প্রচলিত প্রযুক্তি খাতে ব্যয় কমিয়ে এআই সার্ভার, ডেটা স্টোরেজ, মেমরি ও অন্যান্য অবকাঠামোতে বেশি বিনিয়োগ করছে। ফলে আইবিএমের মতো প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসায়িক খাতগুলো চাপের মুখে পড়েছে।
অরবিন্দ কৃষ্ণ জানান, জুন মাসের শেষ দিকে বহু গ্রাহক তাদের মূলধনী ব্যয়ের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করেছেন। সফটওয়্যার ও অন্যান্য আইটি সেবার পরিবর্তে তারা এআই অবকাঠামোতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ শুরু করেন। গ্রাহকদের এ পরিবর্তনের মাত্রা কোম্পানির পূর্বানুমানের বাইরে ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে আইবিএমের ঐতিহ্যবাহী মেইনফ্রেম ব্যবসায়। ব্যাংক, বিমান সংস্থা এবং বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার ও সফটওয়্যার সরবরাহ করে আসা এ খাত এখন পরিবর্তিত প্রযুক্তি বাজারের বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জের মুখে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প রয়টার্সকে বলেন, “আইবিএম ও সফটওয়্যার খাতের জন্য এটি একটি কঠিন সময়। এখন বড় প্রশ্ন হলো, এআই অবকাঠামো ও সাইবার নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রবণতা কতদিন থাকবে। কয়েক মাসের বেশি সময় ধরে এটি চলতে থাকলে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠবে।”
এদিকে আইবিএম জানিয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের আয় প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ শতাংশ হতে পারে, যা গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল পূর্বাভাস। কোম্পানিটির সম্ভাব্য আয় ধরা হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৭২০ কোটি ডলার, যেখানে ওয়াল স্ট্রিট বিশ্লেষকদের গড় পূর্বাভাস ছিল ১ হাজার ৭৮৬ কোটি ডলার।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কয়েক বছর ধরেই মেইনফ্রেম ব্যবসার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ‘রেড হ্যাট’সহ উচ্চ মুনাফার ক্লাউডভিত্তিক সেবার দিকে ঝুঁকছে আইবিএম। তবে এআই-কেন্দ্রিক প্রযুক্তি পরিবর্তনের ধাক্কায় সেই রূপান্তর প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজারের আস্থা পুনরুদ্ধারে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পরিকল্পনাও সামনে এনেছে কোম্পানিটি। আইবিএম জানিয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রথম বৃহৎ বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে তারা ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং এআই-সংক্রান্ত অংশীদারত্বগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এসব উদ্যোগ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এমন আয় আসার সম্ভাবনা কম, যা প্রতিষ্ঠানটির মূল সফটওয়্যার ও অবকাঠামো ব্যবসার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।
আইবিএমের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল আগামী ২২ জুলাই প্রকাশ হওয়ার কথা। বিনিয়োগকারীরা এখন সেই প্রতিবেদনটির দিকেই নজর রাখছেন।
