উপযুক্ত নীতিগত সংস্কার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পখাতের সক্ষমতা জোরদার করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) পোশাক বাজারের প্রায় ১২ শতাংশ অংশীদার হতে পারে বাংলাদেশ। এতে তুলাভিত্তিক পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমবে, রপ্তানি বহুমুখীকরণ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই)।
বিএফটিআইয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব পোশাক শিল্প দ্রুত তুলাভিত্তিক পণ্য থেকে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক এমএমএফ পোশাকের বাজারের আকার প্রায় ৩৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি কৌশলের অংশ হিসেবে এই বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএফটিআইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সাইফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক বাজারে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তাঁর ভাষায়, এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং তৈরি পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি আরও সুসংহত হবে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য একটি রোডম্যাপও উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে ধাপে ধাপে নীতিগত সংস্কার, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের বিকাশ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় আরও সুপারিশ করা হয়েছে, খাতটির বিকাশ ত্বরান্বিত করতে এমএমএফ কাঁচামালের শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, দেশে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার ও সিনথেটিক সুতা উৎপাদন সম্প্রসারণ, সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো প্রধানত তুলাভিত্তিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা দ্রুত সিনথেটিক ও মিশ্র তন্তুর পোশাকের দিকে ঝুঁকছে। ফলে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য পরিবেশে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এমএমএফ খাতের সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
ড. সাইফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কার্যকর নীতিগত সহায়তা এবং সমন্বিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ এমএমএফ উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর সঙ্গে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে এমএমএফ উৎপাদনকারীদের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত ঋণ কর্মসূচি চালু, প্রযুক্তি স্থানান্তরে উৎসাহ দেওয়া এবং অ্যাকটিভওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের মতো উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে দেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আরও বাড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ড. সাইফ উদ্দিন আহমেদ আশা প্রকাশ করেন, সরকারের প্রণীত রোডম্যাপ সময়মতো বাস্তবায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক দশকে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
