অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম নায়ক হাসান মাহমুদ। ম্যাচসেরা এই পেসার নিয়েছেন মোট ৯ উইকেট। তাঁর বোলিংয়ে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবারের মতো টেস্টে হারানোর কৃতিত্ব অর্জন করেছে। সময়ের সঙ্গে সাদা বলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিতি পাওয়া হাসান এখন লাল বলের ক্রিকেটে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন।
ডারউইন টেস্টের স্কোরকার্ডে ম্যাচসেরা হিসেবে হাসান মাহমুদের নামটি লেখা থাকবে। ম্যাচটি যারা দেখেছেন, তাঁদের মনে থাকার মতো আরও একটি দৃশ্য হলো—৬ উইকেট নেওয়ার পর মাঠ ছাড়ার সময় হাতে সেই বল নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা হাসানের মুহূর্তটি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হাসানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে টি-টোয়েন্টি দিয়ে। পরের বছরই ওয়ানডেতে অভিষেক হয় তাঁর। সে সময় মূলত গতি ও কার্যকর ইয়র্কারের জন্য পরিচিত ছিলেন এই পেসার। চোটের আশঙ্কাও ছিল ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের আলোচনায়।
তখন অনেকেই হাসানকে সাদা বলের ক্রিকেটের বোলার হিসেবে দেখতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি। রঙিন পোশাকে আন্তর্জাতিক অভিষেকের চার বছর পর টেস্ট ক্রিকেটে পা রাখেন। বিভিন্ন পরিস্থিতি ও দলের সমীকরণের মধ্য দিয়ে পাওয়া সেই সুযোগই পরে তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এখন হাসানের ক্রিকেটজীবনের বড় অংশজুড়ে জায়গা করে নিয়েছে টেস্ট। দুই দিকে বল সুইং করানোর সক্ষমতা, লেংথ বুঝে বোলিং করার দক্ষতা এবং কাউন্টি ক্রিকেটে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁকে লাল বলের ক্রিকেটে আরও কার্যকর করে তুলেছে। চোটের কারণে মাঝেমধ্যে ছন্দে ব্যাঘাত ঘটলেও তিনি ফিরে এসেছেন এবং লাল বল হাতে আবারও নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টের আগে পাকিস্তান ও ভারতেও পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন হাসান। সেই ধারাবাহিকতার পর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে তাঁর বোলিং আরও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে মাঠের বাইরের হাসান মাহমুদকে দেখলে তাঁর বোলিংয়ের আগ্রাসনের সঙ্গে খুব একটা মিল পাওয়া যায় না। তিনি স্বভাবতই মৃদুভাষী এবং ধীরস্থিরভাবে কথা বলেন। ইংরেজিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর সাবলীলতা নিয়ে আলোচনা হলেও, কাছ থেকে তাঁকে দেখলে বরং সংযত ও কম কথার মানুষ হিসেবেই মনে হয়।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও হাসানের বক্তব্যে সাধারণত চমকপ্রদ মন্তব্যের চেয়ে ক্রিকেটের খুঁটিনাটি বেশি উঠে আসে। ম্যাচের পরিস্থিতি, বোলিংয়ের পরিকল্পনা কিংবা নিজের পারফরম্যান্স—সবকিছু নিয়েই তিনি গুছিয়ে কথা বলেন। ক্রিকেট সম্পর্কে তাঁর বোঝাপড়াও কথাবার্তায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবার পাঁচ উইকেট নেওয়ার পর হাসান একসময় টেস্টে ৪০০ থেকে ৫০০ উইকেট নেওয়ার স্বপ্নের কথাও বলেছিলেন। বাংলাদেশের কোনো পেসার এখনো টেস্টে ১০০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁতে পারেননি—এই বাস্তবতায় তাঁর সেই লক্ষ্য অনেক বড় বলেই মনে হতে পারে। তবে হাসানের বক্তব্যে সেটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন, আত্মম্ভরিতা নয়।
বরং সতীর্থ ও ব্যাটসম্যানদের প্রতি তাঁর সংবেদনশীলতার পরিচয়ও পাওয়া যায়। ব্যাটসম্যানদের খারাপ লাগতে পারে—এই ভাবনা থেকে তিনি অনেক সময় উইকেট পাওয়ার পর উদ্যাপন করতেও অনাগ্রহী থাকেন।
হাসানের ক্যারিয়ারও যেন তাঁর স্বভাবের মতোই ধীরগতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেছে। শুরুতে সাদা বলের ক্রিকেটে পরিচিতি পেলেও সময়ের সঙ্গে টেস্ট ক্রিকেটে নিজের শক্তি খুঁজে পেয়েছেন। পাকিস্তান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাঁর সাম্প্রতিক সাফল্য সেই পরিবর্তনেরই প্রমাণ দিচ্ছে।
ডারউইন টেস্টে তানজিদ হাসান, নাজমুল হোসেন, মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ বাংলাদেশের জয়ের গুরুত্বপূর্ণ চার নায়ক। তাঁদের সম্মিলিত পারফরম্যান্সে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ পেয়েছে স্মরণীয় এক জয়।
হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ার শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, সেটি সময়ই বলবে। তবে ডারউইন টেস্টের পর তাঁর নাম বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে বিশেষভাবে লেখা হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ যখন প্রথমবার টেস্টে হারাল, সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের ম্যাচসেরা ছিলেন এক বাংলাদেশি পেসার—হাসান মাহমুদ।
তাঁকে মনে রাখার জন্য এর চেয়ে বড় কারণ আর কী হতে পারে।
