ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যেসব দেশ ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে সহায়তা করবে, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ দুই বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়াকে এ পরিকল্পনার আওতায় আনা ওয়াশিংটনের জন্য সহজ হবে না।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন পদক্ষেপকে তিনি ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ বা চূড়ান্ত অর্থনৈতিক আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করা দেশগুলোকে তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময়, জাহাজ নিবন্ধন ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সুযোগ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে চীনের গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলতে পারে।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, ট্রাম্প এমন একটি সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার চেষ্টা করছেন, যার জন্য সাধারণত একাধিক দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, চীন, রাশিয়াসহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের সুযোগও সীমিত। দেশটির ওপর এরই মধ্যে ব্যাপক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং মস্কো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে নিজেদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার নানা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
অন্যদিকে চীনও নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে বিভিন্ন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার নজির রেখেছে।
ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানি করা তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কিনেছে চীন।
চীনের তেল শোধনাগারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ স্বাধীনভাবে পরিচালিত এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম।
তবে চীনের বড় ব্যাংকগুলো ইরানের অর্থ লেনদেনে যুক্ত হলে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন পদক্ষেপ বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ব্রান্ডাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিবিষয়ক অধ্যাপক নাদের হাবিবির মতে, ইরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে যুক্তরাষ্ট্র উৎসাহিত করেছে। তাঁর ধারণা, ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ওপরও ওয়াশিংটন চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সমস্যার সমাধান হবে না। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের চীন ও এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জির মতে, ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে ট্রাম্পের হুমকির কারণে চীন-ইরান সম্পর্ক বা বিদ্যমান বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।
তিনি মনে করেন, ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয় পক্ষই আপাতত সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে আগ্রহী। বিশেষ করে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সম্ভাব্য ওয়াশিংটন সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করা কোনো পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক হবে না।
চীনের তুলনায় ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যের পরিমাণ কম হলেও দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে মস্কো ও তেহরান।
রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই সিভিলেভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান ২০ বছর মেয়াদি একটি অংশীদারি চুক্তি করে। একই বছরের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতারও খবর রয়েছে। এনবিসি নিউজ ইউরোপীয় একটি সরকারি নথির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ড্রোন তৈরির সরঞ্জাম, গোলাবারুদ ও টিএনটি পাঠিয়েছে।
রাশিয়ার ওপর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা থাকায় মস্কোর বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক চাপ আরোপ করে ইরানের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন হতে পারে।
পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে ইরান ব্রিকসের মাধ্যমে বিকল্প অর্থনৈতিক পথ তৈরির চেষ্টা করছে। রাশিয়া, চীন, ভারত ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলো নিয়ে গঠিত এই জোটে ইরানও সদস্য।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেম্মাতি জানিয়েছেন, দেশটি ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে ইরানের জন্য নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইরান একই সঙ্গে ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন এবং দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় মুদ্রা সহযোগিতার বিষয়েও কাজ করছে।
তবে ইরানের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক চাপের সমালোচনা করে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে বিশ্ব অর্থনীতি ও দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন।
তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনির মতে, কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান বিকল্প পথ খুঁজে নিতে সক্ষম হবে। তাঁর বিশ্লেষণ, ইরানকে চাপে ফেলতে গিয়ে ট্রাম্প এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যেখান থেকে জয়ী হয়ে বের হওয়া যেমন কঠিন, তেমনি সহজে সরে আসাও সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ তৈরির মার্কিন পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান। ওয়াশিংটন যদি তেহরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদেরও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে চায়, তাহলে ইরান সংকটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
