কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বিভক্তি নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিশোরগঞ্জ সফরকে ঘিরে দুটি ঘটনায়। সফরের দিন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে পরাজিত সৈয়দ এহসানুল হুদাকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে ওই সময় এলাকায় ছিলেন না কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান; হৃদ্রোগজনিত সমস্যায় চিকিৎসার জন্য তিনি সিঙ্গাপুরে ছিলেন।
১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় এহসানুল হুদাকে গাড়িতে তুলে নেওয়ার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এহসানুলের অনুসারীরা ঘটনাটিকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তাঁর অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে মজিবুর রহমানের অনুসারীদের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে ওঠাকে স্থানীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বের মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বাজিতপুরে বিএনপির বর্তমান বিভক্তির সূত্রপাত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে শেখ মজিবুর রহমানকে প্রাথমিকভাবে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর তাঁর বাবা প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন সৈয়দ এহসানুল হুদা। এরপর তাঁকে ওই আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয়।
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন শেখ মজিবুর রহমান। তিনি বিএনপির প্রার্থী এহসানুল হুদাকে ১৩ হাজার ১৫৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি শেখ মজিবুর রহমানকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই কারণে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেওয়া বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলার ৮৩ জন নেতাকেও বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কারের পরও মজিবুর ও তাঁর অনুসারীরা স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন।
১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফরের ঘোষণা আসার পর বাজিতপুরের দুই পক্ষের নেতা-কর্মীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। উভয় পক্ষই প্রস্তুতি সভা করে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করে।
মজিবুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে আলোচনা ছিল, সফরের দিন তিনি প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে থাকবেন এবং এহসানুল হুদা থাকবেন মঞ্চের নিচে। বহিষ্কৃত নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতিবাচক কোনো বার্তা আসতে পারে—এমন আশাও ছিল তাঁদের মধ্যে।
কিন্তু ১৫ আগস্ট রাতে পরিস্থিতি বদলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজিবুর রহমানের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে জানা যায়, হৃদ্রোগজনিত সমস্যায় চিকিৎসার জন্য ওই রাতেই তিনি সিঙ্গাপুরে যান। ফলে পরদিন প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে এহসানুল হুদার অনুসারীরা প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। একই রঙের গেঞ্জি ও টুপি পরে তাঁদের একটি অংশ সকাল থেকেই কটিয়াদী এলাকায় অবস্থান নেয়।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি শেষে পথে এহসানুল হুদাকে দেখতে পেয়ে তাঁর গাড়ি থামান তারেক রহমান। পরে এহসানুলকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন তিনি। সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বাজিতপুরের বিএনপির রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।
বাজিতপুর পৌর বিএনপির সভাপতি এহসান কুফিয়া বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ডাক দিয়ে এহসানুল হুদাকে গাড়িতে তুলে নিয়েছেন। এটা শুধু গাড়িতে ওঠার ঘটনা নয়; বাজিতপুর-নিকলীর বিএনপির রাজনীতির জন্য এটি বড় বার্তা।’
এহসানুলের অনুসারীদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর এই সাক্ষাৎ স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থানকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে।
তবে শেখ মজিবুর রহমানের অনুসারীরা ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বহিষ্কৃত উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, মজিবুর রহমানের হৃদ্রোগের সমস্যা রয়েছে এবং হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যেতে হয়েছিল।
মনিরুজ্জামানের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে কারও ওঠার অর্থ এই নয় যে স্থানীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে চলে গেছে। তাঁর মতে, বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে দেখার প্রয়োজন নেই।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে মজিবুর পক্ষের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খলা এড়াতে জেলা নেতাদের পক্ষ থেকে নেতা-কর্মীদের সংযত থাকতে বলা হয়েছিল। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার সময়ের ব্যাপার বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাজিতপুরের কয়েকজন নেতা-কর্মীর ভাষ্য, দুই পক্ষের দুই নেতার কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি দিয়ে বিচার করা হচ্ছে।
বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তিনি বলেন, একজনকে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে ওঠানো এবং অন্যজনের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যাওয়া—দুটি ঘটনাই এখন বাজিতপুরের বিএনপির রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয়। তাঁর মতে, দলটি বর্তমানে বড় ধরনের সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম বাজিতপুরের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চিকিৎসা শেষে গত বুধবার দেশে ফেরেন শেখ মজিবুর রহমান। পরদিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটও দেন তিনি। ভোট দেওয়ার পর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। নবনির্বাচিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর পাশেও ফুলের তোড়া হাতে তাঁর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন অনুসারীরা। ওই সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মঈন খানও সেখানে ছিলেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ এহসানুল হুদা। সেখানে রুহুল কবির রিজভী ও আন্দালিভ রহমান পার্থের পাশে তাঁর দাঁড়িয়ে থাকার ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে বাজিতপুরের বিএনপির দুই পক্ষের রাজনীতিতে এখন কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কার কতটা ঘনিষ্ঠতা, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের কেউ কেউ মনে করছেন, ‘কার সঙ্গে কার ছবি’—এই হিসাবও এখন দুই পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান বোঝানোর অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
