আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তীব্র গ্যাস-সংকটে কাগজ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে ছাপাখানার উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার, নিয়ম না মেনে মুদ্রণ শুরু এবং দরপত্রে সীমিত প্রতিযোগিতার মতো অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ছাপাখানা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গ্যাসের সংকটে দেশের কাগজ উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ফলে পাঠ্যবই ছাপার অন্যতম প্রধান কাঁচামাল কাগজের সংকট তৈরি হয়েছে। একই সময়ে লোডশেডিং অব্যাহত থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপা ও সরবরাহ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
প্রাক্প্রাথমিকের ৩০টি লটের বই ছাপার কাজ পেয়েছে ১১টি প্রেস। ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানে মুদ্রণকাজ শুরু হয়েছে। তবে কাগজের সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুটি ছাপাখানার মালিক জানিয়েছেন, পাঠ্যবই ছাপার বেশির ভাগ প্রেস রাজধানীর বাইরে ও গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। বড় মুদ্রণযন্ত্র চালাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদনের গতি কমে যাচ্ছে। ফলে নির্ধারিত ৭০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী মার্চের আগে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
পাঠ্যবই মুদ্রণে অনিয়মের অভিযোগও পাওয়া গেছে। কয়েকটি ছাপাখানায় নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ইন্সপেকশন এজেন্ট ১৩২ টন কাগজ বাতিল করেছে।
এর মধ্যে আনন্দ প্রিন্টার্সের ১১০ টন এবং অনুপম প্রিন্টার্সের ২২ টন কাগজ রয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, পাঠ্যবইয়ের মান নিশ্চিত করতে এবং নিম্নমানের কাগজ ও মুদ্রণ ঠেকাতে এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে এনসিটিবি। অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান পরপর তিনবার শোকজ পেলে তার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হবে বলেও জানান তিনি।
কয়েকটি ছাপাখানা কাগজের অনুমোদন না নিয়েই পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ শুরু করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এনসিটিবির প্রাথমিক স্তরের ইন্সপেকশন এজেন্ট ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজিম মুনির জানিয়েছেন, কাগজের মান নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ না করলে অনুমোদন দেওয়া হবে না।
তিনি জানান, ম্যাপ পেপার বোর্ড মিলস লিমিটেডের সরবরাহ করা কাগজের উজ্জ্বলতা নির্ধারিত মানের তুলনায় কম এবং কাগজের পুরুত্বও বেশি হওয়ায় তা গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া টিকে পেপার মিল ও ম্যাপ পেপার বোর্ড মিলস লিমিটেডের কাগজে জিএসএম, পুরুত্ব, অপাসিটি ও বার্স্টিং ফ্যাক্টরের মানও নির্ধারিত মাত্রার নিচে পাওয়া গেছে।
নিম্নমানের কাগজ সরবরাহের অভিযোগ নিয়ে ছাপাখানা ও কাগজকল মালিকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও রয়েছে। ছাপাখানা মালিকদের দাবি, মিল মালিকরা নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করেছেন। অন্যদিকে মিল মালিকদের অভিযোগ, কম দামে কাগজ দিতে ছাপাখানা মালিকরাই নিম্নমানের কাগজ চেয়েছেন।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের কাগজে ব্রাইটনেস ৮৫ শতাংশ, বার্স্টিং ফ্যাক্টর ১৮ এবং অপাসিটি ৮৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাক্প্রাথমিকের বইয়ের ক্ষেত্রে ব্রাইটনেস ৮৫ শতাংশ, বার্স্টিং ফ্যাক্টর ২০ এবং অপাসিটি ৯০ শতাংশ রাখার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৩০ কোটি ৬১ লাখ বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের জন্য ৫৯৬টি লটে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০টি লটে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
এনসিটিবি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় কাজের প্রায় ৯০ শতাংশ ৮ থেকে ১০টি ছাপাখানার মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি লটে প্রাক্কলিত দরের চেয়েও বেশি দর প্রস্তাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে সরকারি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে এক হাজারের বেশি ছাপাখানা থাকলেও সরকারি বই ছাপার কাজে প্রতিযোগিতা খুবই সীমিত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই মুদ্রণে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ে ত্রুটি এবং সময়মতো বই সরবরাহে ব্যর্থতার অভিযোগে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে এক বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
পরে প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের পর বোর্ডের সিদ্ধান্তে মুচলেকার ভিত্তিতে তাদের কালো তালিকা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ফলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই মুদ্রণের দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে তারা।
অব্যাহতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—নাহার প্রিন্টার্স, আমাজন প্রিন্টিং প্রেস, বর্ণমালা প্রেস, পিবিএস প্রিন্টার্স, টাঙ্গাইল অফসেট প্রেস, হাক্কানী প্রিন্টার্স ও সোহাগী প্রিন্টার্স।
একজন ছাপাখানা মালিক বলেন, মাঝারি ও ছোট প্রেসগুলোর সক্ষমতা থাকলেও বড় কাজের দরপত্রে নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করা কঠিন হওয়ায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের ই-টেন্ডার নিয়ে আরও একটি অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শুরুতে প্রতি ফর্মার কস্ট এস্টিমেট ৩ টাকা ১০ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও টেন্ডার চালু থাকা অবস্থায় তা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়।
প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা করে বাড়ানোর ফলে বিপুল সংখ্যক ফর্মার হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক শ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির এক কর্মকর্তা জানান, কস্ট এস্টিমেট পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। টেন্ডার চালু হওয়ার পর কমিটি মনে করে, নির্ধারিত অর্থ কম হয়েছে। এরপর চেয়ারম্যানের নির্দেশে প্রতি ফর্মার মূল্য আরও ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়।
