বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছে ভারত। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। তবে এখনো এ সফরের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ।
সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি ই-মেইলে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিলের কথা জানানো হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর মহড়ার কারণে অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু তখন পর্যন্ত তাঁর ভারত সফরের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। পরে ই-মেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই আলোচনা চলছে। বিএনপি ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর হতে পারে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ভারত জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধটি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভারত অবশ্য নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করছে। তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাঁকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। তারেক রহমান দিল্লি গেলে তাঁকে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ ও স্মরণীয় অভ্যর্থনা দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে শেখ হাসিনা ভারতে থাকা অবস্থায় দিল্লি সফর করলে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তারেক রহমানের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন। তাঁর মতে, শেখ হাসিনার দিল্লিতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও বাংলাদেশে ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্কও রয়েছে। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যার বড় অংশই ভারতের পক্ষে গেছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের গুরুত্ব রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দুই দেশ সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ সম্প্রসারণে কাজ করেছে। একই সময়ে নিরাপত্তা সহযোগিতাও জোরদার হয়েছিল।
তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে। সমালোচকেরা অভিযোগ করেছিলেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো দিল্লি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
ভারতের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা ও ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হয়েছে। এসব অগ্রগতি দিল্লি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এ ছাড়া চলতি মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তিও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের আগ্রহের কারণ হয়েছে। চুক্তিটির বিস্তারিত ও অংশীদারদের দায়িত্ব সম্পর্কে সব তথ্য স্পষ্ট নয়। তবে এটি ন্যাটোর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে তাতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। তিনি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা জানিয়েছেন।
তবে অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বাংলাদেশকে কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি শুধু ভারতকে অসন্তুষ্ট করার প্রশ্ন নয়; চুক্তিটি বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা দেখার জন্যও সময় নেওয়া প্রয়োজন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতায় তারেক রহমানের সরকারও এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি দেখাতে চাইছে, যা শুধু বড় প্রতিবেশী ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয়। অধ্যাপক ইয়াসমিনের মতে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন বসার আগে তারেক রহমানের দিল্লি সফর করা উচিত।
আরেকটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি হতে পারে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। ওই সময় ভারত একটি ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করবে এবং বাংলাদেশকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহের আমন্ত্রণ, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং ভুল সময়ে প্রকাশিত একটি ই-মেইলের পর এখন দিল্লির প্রত্যাশা—শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন।
