ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক হারে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রভাব পড়েছে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতায়। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সীমিত প্রতিরোধক্ষমতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ। এ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্ররা ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর ফলে ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় কমান্ডের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও ন্যাটোর এক কর্মকর্তা জানান, ইউরোপে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের ঘাটতি এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার মজুদ কমে যাওয়াকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা রাশিয়ার উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর হাতে থাকা মজুদ দীর্ঘস্থায়ী হামলা মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে ওই মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন।
তিনি বলেন, রাশিয়া যদি ইউরোপে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তাহলে একের পর এক আঘাত মোকাবিলায় ন্যাটোর বিকল্প সীমিত হয়ে যেতে পারে। এমনকি একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর সক্ষমতাও বর্তমানে খুব সীমিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়টসহ বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ। তবে কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে মজুদ কমার গতি অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়েছে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ানের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট মজুদের প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। মোট প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্যবহারের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
ক্যানসিয়ানের মতে, ইউক্রেনকে দেওয়া প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে।
তবে ইউরোপে প্যাট্রিয়টের মজুদ ‘সংকটজনক পর্যায়েরও নিচে’ নেমে গেছে—এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় ন্যাটো। জোটটির জ্যেষ্ঠ সামরিক মুখপাত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কর্নেল মার্টিন ও’ডনেল বলেছেন, ন্যাটোর হাতে হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতা রয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেলও যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়ার দাবি নাকচ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেখানে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেবেন, সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মতো অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমে যাওয়া নয়; বরং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার বিকল্পও সীমিত।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির পাঁচ গুণের বেশি গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে আসতে পারে। ফলে এগুলো শনাক্ত, গতিপথ নির্ধারণ এবং প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হাতে সময় থাকে খুব কম।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা প্রথমে আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে, এরপর তার গতিপথ বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি সীমিত একটি এলাকা রক্ষা করতে পারে; তাই এটি একটি সামরিক স্থাপনা রক্ষা করতে সক্ষম হলেও পুরো শহরকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।
ইউরোপের বিকল্প হিসেবে ফ্রান্স ও ইতালির তৈরি এসএএমপি/টি এনজি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে। ইউক্রেনে এ ব্যবস্থা সরবরাহ দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফ্রান্স। তবে নতুন সংস্করণটি এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত হয়নি।
প্যাট্রিয়টের মজুদ দ্রুত পুনর্গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ক্যানসিয়ানের হিসাবে, এ বছর ইউরোপের জন্য নির্ধারিত ক্ষেপণাস্ত্রসহ প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট উৎপাদনের কথা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ২ হাজারটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
ন্যাটো জানিয়েছে, ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের প্রথম কারখানা জার্মানিতে সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার কথা। আগামী বছরের শুরুতে সেখান থেকে সরবরাহ শুরু হতে পারে।
জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া ও স্পেনসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য অর্ডার দিয়েছে। তবে নতুন উৎপাদন শুরু না হওয়া পর্যন্ত কিছু দেশের কাছে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও তা ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত গোলাবারুদ না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা সতর্ক করেছেন।
ইউরোপে এখনই রাশিয়ার হামলার আশঙ্কা নেই। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপের কোনো কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সক্ষমতা রাশিয়া অর্জন করতে পারে বলে ন্যাটো ও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন। তাদের ধারণা, এর মধ্যে প্যাট্রিয়টের মজুদ পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। একই সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা ব্যস্ত থাকাও ইউরোপের সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
