মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দেখা মেলে বিরল ও নান্দনিক গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ রামবাসকের। লালচে নলাকার ফুলের পাশাপাশি ভেষজ গুণের জন্যও পরিচিত এই উদ্ভিদ।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের গভীর বনে দেখা মেলে নানা ধরনের উদ্ভিদের। এসব উদ্ভিদের মধ্যে লালচে রঙের আকর্ষণীয় ফুলে সহজেই নজর কাড়ে রামবাসক বা লাল বাসক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বনাঞ্চলেও এই উদ্ভিদের বিস্তৃতি রয়েছে।
রামবাসকের বৈজ্ঞানিক নাম Phlogacanthus thyrsiformis। এটি Acanthaceae পরিবারের বহুবর্ষজীবী শাখা-প্রশাখাযুক্ত গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত গাছটি ঝোপালো হয়ে বেড়ে ওঠে এবং ৩ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ভারতের গাড়োয়াল অঞ্চলে এটি ৬ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত বাড়তে দেখা যায়।
এর পাতার বিন্যাস বিপরীতমুখী। পাতাগুলো বেশ বড় ও উপবৃত্তাকার এবং প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতার দুই প্রান্ত সূক্ষ্ম এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিনারা কিছুটা খাঁজকাটা।
তবে রামবাসকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর ফুল। ফুলগুলো নলাকার ও লালচে রঙের এবং দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার হয়। পাঁচটি পাপড়ি যুক্ত হয়ে নলাকার আকৃতি তৈরি করে। ফুলের নিচের ঠোঁট তিন খণ্ডে এবং ওপরের ঠোঁট দুই খণ্ডে বিভক্ত।
ফুলের আকৃতিকে হাঁ-করা সিংহমুখের মতো মনে হওয়ায় উদ্ভিদটি ‘সিংহাস্য’ নামেও পরিচিত। আবার পুষ্পদণ্ডের গঠন ও স্তবকিত ফুলের কারণে এর আরেক নাম ‘সিংহপুচ্ছ’। ইংরেজিতে এটি Curved-Flower Flame-Acanthus নামে পরিচিত।
বাংলাদেশের পাশাপাশি উত্তর ভারত, চীনের ইউনান, ভুটান, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের পাহাড়ি অঞ্চল, ঝোপঝাড় এবং নদীর পাড়ে রামবাসক জন্মে। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের বনাঞ্চলেও এর দেখা মেলে।
রামবাসক ও পরিচিত সাধারণ বাসক একই পরিবারের উদ্ভিদ। গাছটির তিতা স্বাদের কারণে কোথাও কোথাও এটি ‘তিতাফুল’ বা ‘লাল বাসক’ নামেও পরিচিত। মণিপুরি সম্প্রদায়ের কাছে উদ্ভিদটি ‘নংমাংখা আসিনবা’ নামে পরিচিত।
ভেষজ চিকিৎসায়ও রামবাসকের ব্যবহার রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ বাসকের মতো রামবাসকেরও বিভিন্ন ভেষজ গুণ রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ঠান্ডা-কাশি, অ্যাজমা, হুপিং কাশি ও রক্তপিত্তের মতো সমস্যায় এর ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। মণিপুরে কফ ও জ্বরের জন্য এর পাতা সেদ্ধ করে চায়ের মতো পান করার ঐতিহ্য রয়েছে। তবে ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রা জানা জরুরি।
কিছু অঞ্চলে রামবাসক খাবার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। মণিপুরে এর তাজা ও ভেজে নেওয়া ফুল খাওয়া হয়। ভারতের অরুণাচল প্রদেশে এর ফুল পিষে রান্নায় মসলা হিসেবেও ব্যবহার করার তথ্য রয়েছে।
প্রকৃতির বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ লাউয়াছড়ার মতো বনাঞ্চলে রামবাসকের উপস্থিতি উদ্ভিদবৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নান্দনিক ফুল ও স্থানীয় ভেষজ ব্যবহারের কারণে এই উদ্ভিদ প্রকৃতি ও মানুষের লোকায়ত জ্ঞানের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত।
