আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ভারতের আরও জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ চেয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ইরান কখনো যুদ্ধকে স্বাগত জানায়নি এবং চলমান সংঘাত ইরান, অঞ্চল বা মানবতার কারও স্বার্থে নয়।
কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) ও ‘সাংহাই প্লাস’ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন পেজেশকিয়ান।
সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় ইরানের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য ভারতকে ধন্যবাদ জানান ইরানের প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ভারতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, তার প্রশাসনের শুরু থেকেই ইরানের নীতি ছিল শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান করা। তবে তার দাবি, কূটনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরান কখনো যুদ্ধকে স্বাগত জানায় না। ইরানি জনগণকে বিপদ ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে রক্ষা করা এবং শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় ইরান তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তার দায়বদ্ধতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপরও তেহরান একটি চুক্তি ও পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান পেজেশকিয়ান।
পেজেশকিয়ান বলেন, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ইরানের স্বার্থে নয়, এই অঞ্চলের স্বার্থেও নয় এবং মানবতার স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যুক্তি ও বাস্তববোধের ভিত্তিতে যুদ্ধ ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান তিনি।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরের কিছু গোষ্ঠী সংঘাত অব্যাহত রাখার মধ্যেই নিজেদের স্বার্থ দেখতে পারে। এ অবস্থায় শান্তির পক্ষে প্রচেষ্টা জোরদার করে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ভারতের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অবস্থানের কথা তুলে ধরে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান ও ভারতের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ ও রক্তপাত থেকে সরে এসে সংলাপ ও সমঝোতার দিকে এগিয়ে যেতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যুক্তিবাদী শক্তিগুলোর আকাঙ্ক্ষা শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তি এবং যুদ্ধ এড়িয়ে চলা। বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট সব ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণে তার দেশের প্রস্তুতির কথা জানান। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের ব্যাপক সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় যৌথ প্রচেষ্টা এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করা তেহরান ও নয়াদিল্লির সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন পেজেশকিয়ান।
অন্যদিকে, মোদি পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কঠিন সময়ে ভারত ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা ও যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
পেজেশকিয়ানের শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মোদি তাকে শান্তিপ্রিয় নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার প্রচেষ্টা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে দুই নেতা পরিবহন ও সামুদ্রিক সহযোগিতা, হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং চাবাহার বন্দরে সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং ইরান-ভারতের কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদারে বিদ্যমান সক্ষমতাগুলো কাজে লাগানোর গুরুত্বের ওপর জোর দেন তারা।
সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি
