রাজধানীর খিলক্ষেতে স্ত্রী মুক্তা ইসলামকে শিকল দিয়ে বেঁধে বেল্ট দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামী সোহেল শিকদারের (৩১) বিরুদ্ধে। নির্যাতনের একটি ভিডিও মুক্তার ভাইয়ের মোবাইলে পাঠিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। এর তিন দিন পর খিলক্ষেতের বাসা থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মুক্তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় ৪ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন মুক্তার ভাই তানভীর রহমান। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার মূল অভিযুক্ত সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।
মামলার এজাহার ও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্তাকে কয়েক মাস ধরে যৌতুক এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহে নির্যাতন করা হচ্ছিল। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট তাঁকে বেল্ট দিয়ে মারধর করে আহত করা হয়। ওই নির্যাতনের ভিডিও এক স্বজনের মোবাইলে পাঠান সোহেল এবং মুক্তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোহেলের ধারণ করা প্রায় তিন মিনিটের ভিডিওতে মুক্তাকে বেল্ট দিয়ে মারধর এবং গালাগাল করার দৃশ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিওতে সোহেল তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেন। মুক্তা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে মারধর বন্ধ করার অনুরোধ করলেও নির্যাতন চলতে থাকে।
নির্যাতনের সময় মুক্তার দুই সন্তান—সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়া (৪)—পাশের ঘরে কাঁদছিল। তখন মুক্তা সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে আসার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মুক্তার পরিবারের ভাষ্য, বরিশালের বাকেরগঞ্জে একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে তাঁর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল। খিলক্ষেতে মুদি ও এমব্রয়ডারি ব্যবসায় ব্যর্থ হওয়ার পর সোহেল যৌতুক দাবি করে মুক্তার ওপর নির্যাতন শুরু করেন বলে পরিবারের অভিযোগ।
মুক্তার ভাই তানভীর রহমান বলেন, কয়েক মাস আগে সোহেল তাঁর কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় তাঁর বোনকে মারধর করা হতো বলে দাবি করেন তিনি।
তানভীরের ভাষ্য, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মুক্তার মরদেহ সিলিং ফ্যান থেকে নামানো হয়। তিনি বলেন, মাকে হারিয়ে দুই শিশু সারাদিন কান্নাকাটি করছে এবং বাবার বিরুদ্ধে মাকে মেরে ঝুলিয়ে রাখার কথা বলছে। ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেন তিনি।
মুক্তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ৪ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন তানভীর রহমান। এজাহারে বলা হয়েছে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে—এমন সন্দেহে সোহেল মুক্তাকে নির্যাতন করতেন। ৩০ আগস্ট তাঁকে বেল্ট দিয়ে মারধর করে আহত করা হয়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তার ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়ার খবর পান স্বজনেরা।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন জানান, গৃহবধূকে মারধরের ভিডিওটি তাঁর মৃত্যুর তিন দিন আগের। ঘটনার মূল অভিযুক্ত সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কল বিশ্লেষণের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে ১৮ হাজার ৬২৬টি কল এসেছিল। ২০২৪ সালে এ ধরনের কলের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৩৩টি, যার মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ১১ হাজার ৪১৮টি।
২০২৩ সালে ২৬ হাজার ৭৯৮টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৯ হাজার ৯১৩টি। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭১২টি কলের মধ্যে এমন অভিযোগ ছিল ৬ হাজার ৫৬০টি। আর ২০২১ সালে ১২ হাজার ১৬৯টি অভিযোগের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৩ হাজার ৩৪৮টি।
