ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে আজ শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনে যোগ দিতে প্রায় সাত বছর পর ভারত সফরে এসেছেন সি। তাঁর এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নয়াদিল্লিতে দুই দিনের ব্রিকস সম্মেলনে মোদির আমন্ত্রণে সি চিন পিং ছাড়াও কয়েকজন বিশ্বনেতা অংশ নিচ্ছেন। বৈঠকের মধ্য দিয়ে ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর ভারত-চীন সম্পর্ক যেভাবে বদলেছে, তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০২০ সালে হিমালয়ের পশ্চিমাংশে ভারতের লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের পর সেটিই ছিল দুই দেশের সেনাদের মধ্যে প্রথম প্রাণঘাতী সংঘাত।
ওই সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় ও চার চীনা সেনা নিহত হন। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এর বড় একটি অংশের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা এখনো নির্ধারিত হয়নি এবং তা নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
সীমান্ত সংঘাতের পর ভারত চীনা বিনিয়োগের ওপর নজরদারি বাড়ায়। চীনা নাগরিকদের ব্যবসায়িক ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই কঠোর করা হয় এবং কয়েকটি জনপ্রিয় চীনা মোবাইল অ্যাপ নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, বেইজিংয়ের অভিযোগ ছিল দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। এরপর চীন সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াতসহ দুই দেশের জনগণের যোগাযোগের ওপর বিধিনিষেধ আরও কঠোর করে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ভারত ও চীন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। এর আগে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা পাঁচটি এলাকা থেকে দুই দেশই সেনা সরিয়ে নিয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, বাকি দুটি এলাকা থেকেও সেনা প্রত্যাহার করে ২০২০ সালের আগের অবস্থায় ফেরার কথা ছিল। ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সেই শর্তও পূরণ করা হয়।
এরপর দুই দেশের বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ভারত চীনের সঙ্গে সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করেছে, চীনা পেশাজীবীদের ব্যবসায়িক ভিসা অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করেছে এবং চীনা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধও শিথিল করেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করেছে চীন থেকে। আমদানির পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ১০০টির বেশি পণ্য ভারতের কারখানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সীমান্ত এলাকায় এখনো দুই দেশই বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন রেখেছে।
সম্পর্কে উন্নতি হলেও ভারত ও চীনের মধ্যে বেশ কিছু জটিলতা এখনো রয়ে গেছে। সীমান্তে মাঝেমধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশ নিয়েও দুই দেশের বিরোধ রয়েছে। বেইজিং অঞ্চলটিকে ‘জাংনান’ নামে অভিহিত করে এবং দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে মনে করে।
এ ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সামরিক সংঘাতে চীনের ভূমিকা নিয়েও দুই দেশের সম্পর্ক জটিল হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সংঘাতে চীন সরাসরি জড়িত না থাকলেও পাকিস্তান চীনের তৈরি যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছিল।
বাণিজ্যিক সম্পর্কও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। চীনা সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিকস পণ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভিসা পেতে দেরিসহ বিভিন্ন বাধার কথা ভারতীয় কর্মকর্তারা তুলে ধরেছেন। অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও টেলিযোগাযোগের মতো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সংবেদনশীল খাতে চীনা বিনিয়োগ নিয়েও ভারত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
