দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ পাঁচটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যায়ক্রমে বন্ধ বা অবসায়নের (লিকুইডেশন) মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের অনুমোদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রশাসক নিয়োগের পর প্রথম ধাপে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে।
অবসায়ন বা বন্ধের জন্য চিহ্নিত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো— ফ্যাস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার গ্রাহকের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাথমিকভাবে একজন আমানতকারীকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হবে।
খেলাপি ঋণের হার প্রায় শতভাগ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পোর্টফোলিও প্রায় পুরোপুরিই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে ফ্যাস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ফারইস্ট ফাইন্যান্সে এ হার ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, অ্যাভিভা ফাইন্যান্সে ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
এস আলম ও পিকে হালদারের প্রভাব
পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অ্যাভিভা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ছিলেন চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী এস আলম। অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির কেন্দ্রীয় ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদার।
অভিযোগ রয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া হয়। ফলে বহু বছর ধরে আমানতকারীরা নিজেদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না।
আগের উদ্যোগ, নতুন বাস্তবায়ন
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এসব প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন বা অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার সেই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও এ খাতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আমানত ফেরত কার্যক্রমে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দ্রুত অবসায়নের পথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, প্রশাসক নিয়োগের পর প্রথমে ছোট আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। এরপর অন্যান্য দাবিদাওয়া নিষ্পত্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন লোকসান গুনে এসব প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাই যত দ্রুত সম্ভব অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সূত্র জানায়, প্রথমে পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হবে। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করে প্রশাসকের অধীনে পরিচালনার ব্যবস্থা করা হবে। ব্যাংক খাতে চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মতোই এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
আগেও সতর্ক করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক
গত বছরের মে মাসে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও আমানত ফেরতে ব্যর্থতার কারণে ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় সেগুলো বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে তালিকা পুনর্বিবেচনা করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হলেও সাম্প্রতিক সময়ে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মোহাম্মদ মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “দীর্ঘ ১২ বছর ধরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত ফেরতের সংকট চলছে। আমরা আশা করছি, আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আমানতকারীরা অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া দেখতে পাবেন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা হাজারো আমানতকারীর ভোগান্তি কমবে এবং আর্থিক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
