শ্বেত বামন নক্ষত্রকে ঘিরে ঘূর্ণায়মান এক বিরল গ্রহের সন্ধান, ভবিষ্যৎ সৌরজগত নিয়ে আশাবাদী জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা
পৃথিবী থেকে প্রায় ৮০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি অস্বাভাবিক গ্রহকে ঘিরে পরিচালিত নতুন গবেষণায় সৌরজগতের বহু দূরবর্তী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, একটি মৃতপ্রায় নক্ষত্র বা শ্বেত বামনকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান বিশাল গ্যাসীয় গ্রহের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে কোনো নক্ষত্রের মৃত্যু মানেই তার গ্রহগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি নয়। বরং কিছু গ্রহ নক্ষত্রের মৃত্যুর পরও টিকে থাকতে পারে এবং নতুন পরিবেশে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হতে পারে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় WD 1856 b নামের একটি গ্যাসীয় গ্রহকে নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই গ্রহটি ভবিষ্যতে সূর্য ও সৌরজগতের সম্ভাব্য বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সূর্যের সামনে এখনও প্রায় ৫০০ কোটি বছরের জীবন বাকি রয়েছে। তবে একসময় এর কেন্দ্রস্থলের হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে। তখন সূর্য বর্তমান আকারের প্রায় ১০০ গুণ বড় লাল দানব (Red Giant) নক্ষত্রে পরিণত হবে।
এই পর্যায়ে সূর্যের প্রসারণের ফলে বুধ, শুক্র এবং সম্ভবত পৃথিবীও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। পরবর্তীতে সূর্য তার বাইরের স্তর ঝরিয়ে শ্বেত বামন নক্ষত্রে রূপান্তরিত হবে।
কিন্তু বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের মতো বাইরের গ্রহগুলোর কী হবে—সে প্রশ্নের উত্তর এতদিন স্পষ্ট ছিল না। নতুন গবেষণা সেই রহস্যের কিছুটা উন্মোচন করেছে।
WD 1856 b আকারে বৃহস্পতির সমান হলেও এটি যে শ্বেত বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, তার আকার পৃথিবীর কাছাকাছি। অর্থাৎ গ্রহটি তার কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বড়।
২০২০ সালে নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট (TESS) এবং স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে প্রথম এই গ্রহটি শনাক্ত করা হয়।
গবেষকদের বিস্মিত করেছে এর কক্ষপথ। গ্রহটি তার নক্ষত্রের এতটাই কাছে অবস্থান করছে যে পৃথিবী সূর্য থেকে যত দূরে রয়েছে, তার তুলনায় প্রায় ৫০ গুণ কম দূরত্বে এটি ঘুরছে। এত কাছাকাছি অবস্থানে থেকেও গ্রহটির টিকে থাকা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে একটি বড় ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই গ্রহের বর্তমান অবস্থান ব্যাখ্যা করতে দুটি সম্ভাব্য তত্ত্ব রয়েছে।
প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী, নক্ষত্রটি যখন লাল দানবে রূপান্তরিত হচ্ছিল, তখন গ্রহটি তার ভেতরে প্রবেশ করেও কোনোভাবে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।
দ্বিতীয় তত্ত্বে বলা হচ্ছে, একই নক্ষত্র ব্যবস্থায় থাকা অন্যান্য নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে ধীরে ধীরে গ্রহটির কক্ষপথ পরিবর্তিত হয়েছে এবং এটি বর্তমান অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।
গবেষণা দলের সদস্যরা মনে করছেন, দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) ব্যবহার করে গ্রহটির তাপমাত্রা, ভর এবং বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, WD 1856 b-এর তাপমাত্রা প্রায় ৪০০ কেলভিন বা প্রায় ১২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শ্বেত বামন নক্ষত্র থেকে পাওয়া শক্তির তুলনায় এটি অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
গবেষকদের ধারণা, অতীতে নক্ষত্রের বিবর্তনজনিত প্রক্রিয়া অথবা শ্বেত বামনের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার সময় সৃষ্ট মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে গ্রহটি অতিরিক্ত তাপ সঞ্চয় করেছিল। সেই তাপের অবশিষ্টাংশ এখনও বজায় রয়েছে।
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণে গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে মিথেনসহ বিভিন্ন হাইড্রোকার্বন যৌগ এবং সূক্ষ্ম মেঘকণার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মৃত নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এ ধরনের উপাদান শনাক্ত হওয়ার ঘটনা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
গবেষণা দলের সদস্যদের মতে, WD 1856 b কার্যত একটি “মহাজাগতিক সময়যন্ত্র” হিসেবে কাজ করছে। কারণ এটি এমন একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট দেখাচ্ছে, যা কয়েকশ কোটি বছর পর আমাদের সৌরজগতেও ঘটতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের আরও পর্যবেক্ষণ থেকে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল, গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যাবে।
নতুন এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নক্ষত্রের মৃত্যু সব সময় তার চারপাশের গ্রহগুলোর সমাপ্তি ডেকে আনে না। কিছু গ্রহ হয়তো চরম পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও টিকে থাকতে পারে। ফলে সূর্যের ভবিষ্যৎ এবং সৌরজগতের দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তন নিয়ে গবেষণায় WD 1856 b একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
