কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে ৫৭৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের বৃহৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং সোমবার এই কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে নেতৃত্ব ধরে রাখতে সেমিকন্ডাক্টর, এআই ডেটা সেন্টার এবং ফিজিক্যাল এআই অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা হবে।
সিউলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট লির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের শীর্ষ দুই মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ইলেকট্রনিকস এবং এসকে হাইনিক্সের শীর্ষ কর্মকর্তারা। সরকারের নতুন পরিকল্পনার আওতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একাধিক অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স তাদের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে প্রায় ৮০০ ট্রিলিয়ন ওন বিনিয়োগ করবে। এই অর্থ ব্যবহার করে নতুন চিপ উৎপাদন কেন্দ্র বা ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হবে।
এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার গওয়াংজু শহর এবং সাউথ জেওলা প্রদেশ এ প্রকল্পে অতিরিক্ত ৫ থেকে ২০ ট্রিলিয়ন ওন বিনিয়োগ করবে। একইসঙ্গে রাজধানী সিউলের নিকটবর্তী চুংচিয়ং অঞ্চলে চিপ প্যাকেজিং শিল্পকেন্দ্র গড়ে তুলতে আরও ৮১ ট্রিলিয়ন ওন বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট লি বলেন, দ্রুত বাড়তে থাকা বৈশ্বিক চাহিদা পূরণে বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। তাই নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
বর্তমানে এআই প্রযুক্তির বিকাশে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরি চিপের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি (HBM) প্রযুক্তিতে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের অবস্থান বিশ্ববাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই-নির্ভর কম্পিউটিং, ক্লাউড অবকাঠামো, স্বয়ংক্রিয় শিল্প ব্যবস্থা এবং উন্নত ডেটা সেন্টার পরিচালনায় এই ধরনের চিপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার এই বিনিয়োগ কেবল শিল্প সম্প্রসারণ নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো সিউলকেন্দ্রিক শিল্প ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের চাপ কমানো। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প ইয়ংইন ও পিয়ংতেক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।
প্রেসিডেন্ট লি দাবি করেন, নতুন প্রকল্প কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য বিশেষ সুবিধা নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতির ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং শিল্প সক্ষমতা সম্প্রসারণের অংশ।
তিনি বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যমান বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং অনাব্যবহৃত শক্তি সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তবে পরিকল্পনাটি রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট লির রাজনৈতিক সমর্থনঘন এলাকায় বিশাল বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে।
অন্যদিকে শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কারখানা পরিচালনার জন্য বিপুল বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি, দক্ষ জনবল, উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী অবকাঠামো প্রয়োজন। নতুন অঞ্চলে এসব সুবিধা দ্রুত গড়ে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন নিজ নিজ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিপুল ভর্তুকি ও বিনিয়োগ দিচ্ছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার এই মেগা প্রকল্পকে বৈশ্বিক চিপ যুদ্ধের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ কোরিয়া কেবল মেমোরি চিপ নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অর্থনীতির যুগে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ কোরিয়ার ৫৭৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বিশ্ব প্রযুক্তি খাতে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং এআই শিল্পে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া এই উদ্যোগ আগামী দশকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারে।
