ইউরোপজুড়ে তীব্র গরমে বাড়ছে প্রাণহানি; জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা
স্পেনে সাম্প্রতিক তীব্র তাপপ্রবাহে এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাস দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ সময় হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্য ও আবহাওয়া সংস্থাগুলোর প্রকাশিত তথ্য বলছে, ইউরোপজুড়ে চলমান অস্বাভাবিক গরম জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে।
বুধবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ দিকে ইউরোপে আঘাত হানা তাপপ্রবাহে স্পেনে অন্তত ১ হাজার ২৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির কার্লোস তৃতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, এসব মৃত্যু সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত তাপমাত্রাজনিত স্বাস্থ্য জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসে তাপজনিত কারণে ৪০৭ জনের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। সেই তুলনায় চলতি বছরের প্রাণহানির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ তাপমাত্রা, উষ্ণ রাত এবং প্রবীণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ায় মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
স্পেনের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ফলে বছরের প্রথমার্ধটি দেশটির আবহাওয়া ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, গত এক দশকের মধ্যেই সবচেয়ে উষ্ণ সাতটি প্রথমার্ধের সবগুলোই রেকর্ড হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের প্রবণতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আবহাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জুন মাস ছিল স্পেনের ইতিহাসে দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন। এ সময় গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
বিশেষ করে দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল, যা মানুষের স্বাভাবিক বিশ্রাম ও শারীরিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে।
শুধু স্পেন নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরিতে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙার খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়ে উঠেছে। ফ্রান্সেও গড় তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবং দেশটি ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ রাতগুলোর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষক সংগঠন ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (World Weather Attribution) জানিয়েছে, জুনের শেষ দিকে ইউরোপে যে তাপপ্রবাহ দেখা গেছে, তা মহাদেশটির ইতিহাসে অন্যতম তীব্র ঘটনা।
সংস্থাটির বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এ ধরনের তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। তারা সতর্ক করেছেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো না গেলে ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন এবং ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।
তীব্র গরম শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, কৃষি, জ্বালানি ও শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলছে। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, ফসল উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং বহিরাঙ্গনে কর্মরত শ্রমিকদের কাজের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্রবীণ, শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন।
স্পেনে এক হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। উষ্ণতম প্রথমার্ধের রেকর্ড এবং মহাদেশজুড়ে তাপমাত্রার নতুন নতুন উচ্চতা অর্জন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চরম আবহাওয়া এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের নতুন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
