লাল, সাদা ও নীল রঙে সাজানো মহাজাগতিক বিস্ময়; গ্যালাক্সি, নীহারিকা ও সুপারনোভা অবশেষের নতুন চিত্র উন্মোচন
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা মহাবিশ্বের চারটি নতুন ও দৃষ্টিনন্দন ছবি প্রকাশ করেছে। নাসার চন্দ্রা এক্স-রে অবজারভেটরির সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এসব ছবিতে লাল, সাদা ও নীল রঙের বিশেষ বিন্যাস ব্যবহার করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকার রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে মহাজাগতিক তথ্যকে শব্দে রূপান্তর করে বিশেষ ‘সোনিফিকেশন’ বা মহাকাশীয় সুরও তৈরি করেছে গবেষক দল।
বুধবার প্রকাশিত এই চিত্রগুলোতে দূরবর্তী গ্যালাক্সি ক্লাস্টার, সর্পিল গ্যালাক্সি, নীহারিকা এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশকে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব ছবি শুধু নান্দনিক নয়, বরং মহাবিশ্বের গঠন, ডার্ক ম্যাটার, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু এবং গ্যালাক্সির বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্যও বহন করছে।
নাসার প্রকাশিত ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার ZwCl 0024+1652, সর্পিল গ্যালাক্সি Messier 94 (M94), নীহারিকা NGC 3603 এবং সুপারনোভা অবশেষ Cassiopeia A।
চন্দ্রা এক্স-রে অবজারভেটরির এক্স-রে তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন মহাকাশ ও স্থলভিত্তিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের তথ্য একত্রিত করে এসব ছবি তৈরি করা হয়েছে। ফলে মহাজাগতিক বস্তুর এমন বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান হয়েছে, যা সাধারণ আলোকচিত্রে দেখা সম্ভব নয়।
ZwCl 0024+1652 নামের গ্যালাক্সি ক্লাস্টারটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। ছবিতে লাল অংশগুলো চন্দ্রা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের এক্স-রে তথ্যের মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া অতিগরম গ্যাসকে নির্দেশ করছে।
অন্যদিকে নীল অংশে দেখানো হয়েছে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের অপটিক্যাল তথ্য। গবেষকদের মতে, এই তথ্যের মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতির পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। ডার্ক ম্যাটার সরাসরি দেখা না গেলেও এর মহাকর্ষীয় প্রভাব বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এর অবস্থান নির্ণয় করেন।
পৃথিবী থেকে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত Messier 94 বা M94 গ্যালাক্সিকেও নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অংশে রয়েছে একটি ‘স্টারবার্স্ট রিং’, যেখানে নতুন নক্ষত্র দ্রুত জন্ম নিচ্ছে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, M94-এর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এতে প্রত্যাশিত পরিমাণ ডার্ক ম্যাটার পাওয়া যায় না। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্যতম আগ্রহের বিষয়।
আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ মিল্কিওয়ের ভেতরে অবস্থিত NGC 3603 নীহারিকার ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং গ্যাস, ধূলিকণা ও হাজারো নক্ষত্রে সমৃদ্ধ একটি বিশাল অঞ্চল।
হাবল স্পেস টেলিস্কোপের অপটিক্যাল, ইনফ্রারেড ও অতিবেগুনি তথ্যের সঙ্গে চন্দ্রার এক্স-রে তথ্য যুক্ত করে এই চিত্র তৈরি করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা জানান, NGC 3603-এ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ও উজ্জ্বল কিছু নক্ষত্র রয়েছে। এসব নক্ষত্র দ্রুত জ্বালানি শেষ করে অল্প সময়ের মধ্যেই সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে তাদের জীবনচক্র সম্পন্ন করে।
প্রকাশিত চতুর্থ ছবিটি Cassiopeia A নামের একটি সুপারনোভা অবশেষের। ধারণা করা হয়, এর মূল নক্ষত্রটি সূর্যের তুলনায় ১৫ থেকে ২৫ গুণ বেশি ভরবিশিষ্ট ছিল।
যে বিস্ফোরণের ফলে Cassiopeia A সৃষ্টি হয়েছে, তার আলো পৃথিবীতে পৌঁছেছিল ১৭শ শতকে। তবে নক্ষত্রটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১১ হাজার আলোকবর্ষ দূরে হওয়ায় প্রকৃত বিস্ফোরণটি ঘটেছিল আরও ১০ হাজার বছরেরও বেশি আগে।
এই ছবিতে চন্দ্রার এক্স-রে তথ্যের সঙ্গে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ইনফ্রারেড তথ্য যুক্ত করা হয়েছে, যা বিস্ফোরণের পর সৃষ্ট গ্যাসীয় আবরণকে অভূতপূর্ব স্পষ্টতায় তুলে ধরেছে।
শুধু ছবি নয়, গবেষকরা চন্দ্রা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সংগৃহীত তথ্যকে শব্দে রূপান্তরও করেছেন। ‘সোনিফিকেশন’ নামে পরিচিত এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এক্স-রে ডেটাকে বিভিন্ন সুর ও বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনিতে রূপ দেওয়া হয়েছে।
ফলে সাধারণ মানুষ শুধু মহাবিশ্বকে দেখতেই নয়, শুনতেও পারছেন—যা বিজ্ঞান যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি অভিনব উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মহাকাশবিষয়ক গবেষকরা বলছেন, এ ধরনের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ডার্ক ম্যাটার, নক্ষত্রের বিবর্তন এবং মহাবিশ্বের গঠন নিয়ে জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো সহজভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে।
বিশেষ করে চন্দ্রা, হাবল ও জেমস ওয়েবের মতো শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সমন্বিত তথ্য ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত নাসার নতুন চারটি ছবি মহাবিশ্বের সৌন্দর্য ও বৈজ্ঞানিক রহস্যকে একসঙ্গে তুলে ধরেছে। লাল, সাদা ও নীল রঙে সাজানো এই মহাজাগতিক চিত্রগুলো শুধু উদযাপনের প্রতীক নয়, বরং মানবজাতির মহাবিশ্ব অন্বেষণের দীর্ঘ যাত্রারও এক অনন্য স্মারক।
