দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে, সে বিষয়ে নতুন এক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা বলছেন, মানসিক চাপ শুধু মস্তিষ্ক বা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরই নয়, অন্ত্রের জীবাণু পরিবেশের মাধ্যমে অস্থিমজ্জার স্টেম সেলের কার্যকারিতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে রক্ত ও রোগ প্রতিরোধক কোষ উৎপাদনকারী স্টেম সেলের বার্ধক্য ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বৈজ্ঞানিক সাময়িকী সেল স্টেম সেল-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তন ঘটিয়ে এমন এক জৈবিক প্রক্রিয়া সক্রিয় করতে পারে, যা অস্থিমজ্জার স্টেম সেলের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তবে গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হওয়ায় মানুষের ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়া কার্যকর কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক মেং ঝাও জানান, দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সর্দি-কাশি ও অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই গবেষকরা অনুসন্ধান শুরু করেন যে, মানসিক চাপ কি অস্থিমজ্জার হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেলের কার্যকারিতা কমিয়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয় কিনা।
হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল শরীরের বিভিন্ন ধরনের রক্তকণিকা ও রোগ প্রতিরোধক কোষ তৈরির মূল উৎস। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এই স্টেম সেলগুলোর স্বাভাবিক পুনর্গঠন ক্ষমতা ব্যাহত করে এবং লিম্ফোসাইট নামের গুরুত্বপূর্ণ শ্বেত রক্তকণিকার উৎপাদন কমিয়ে দেয়।
গবেষকদের মতে, মানসিক চাপের সময় মস্তিষ্ক সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমের মাধ্যমে অন্ত্রে সংকেত পাঠায়। এর ফলে অন্ত্রের পরিবেশ ও মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তন ঘটে এবং স্পারমিডিন নামের একটি উপকারী জৈব যৌগের মাত্রা কমে যায়। এই যৌগকে কোষের সুস্থতা ও স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। এর ঘাটতি দেখা দিলে স্টেম সেল ধীরে ধীরে রক্ত ও রোগ প্রতিরোধক কোষ উৎপাদনের সক্ষমতা হারাতে শুরু করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মস্তিষ্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল—মেডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং পেরিয়াকুয়েডাক্টাল গ্রে—এর কার্যকলাপ কমিয়ে দেয়। গবেষকদের দাবি, প্রথমবারের মতো এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু স্নায়বিক অঞ্চল সরাসরি অস্থিমজ্জার স্টেম সেলের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট আশকান ফারহাদি বলেন, মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিদ্যমান ধারণাকে এই গবেষণা আরও বিস্তৃত করেছে। আগে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্ক-অন্ত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা জানলেও এখন দেখা যাচ্ছে, এর প্রভাব অস্থিমজ্জাসহ শরীরের আরও বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে চিকিৎসক ডাং ট্রিন মনে করেন, গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি মানসিক চাপ, অন্ত্রের জীবাণু, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং বার্ধক্যের মধ্যে একটি সম্ভাব্য জৈবিক সংযোগ তুলে ধরেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, গবেষণাটি এখনো প্রাণীভিত্তিক পর্যায়ে রয়েছে এবং মানুষের ক্ষেত্রে একই ফলাফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
গবেষকরা এখন খতিয়ে দেখতে চান, ইঁদুরে শনাক্ত হওয়া এই অন্ত্র-মস্তিষ্ক-অস্থিমজ্জা সংযোগ মানুষের শরীরেও একইভাবে কাজ করে কি না। যদি ভবিষ্যৎ গবেষণায় এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তাহলে বার্ধক্য, ক্যান্সার, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে নতুন ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে ও গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল পরিহার এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
গবেষণাটি ইঙ্গিত করছে যে মানসিক চাপের প্রভাব শুধু মানসিক সুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় উপাদান অস্থিমজ্জার স্টেম সেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যদিও বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন, তবু এটি মানবস্বাস্থ্য ও বার্ধক্যবিষয়ক গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
