মিয়ানমারের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী অং সান সু চি বর্তমানে রাজধানী নেইপিদোতে গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন বলে সামরিক সরকার দাবি করলেও তিনি ঠিক কোথায় আছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি সামরিকপন্থী রাজনীতিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যও তার অবস্থান সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তাকে একাধিক মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে দেশটির সামরিক শাসক ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং ঘোষণা দেন, সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি রাখা হয়েছে।
সামরিক সরকার এ পদক্ষেপকে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করলেও সমালোচকদের অভিযোগ, এটি মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের ভাবমূর্তি উন্নত করার চেষ্টা। তাদের মতে, ৮১ বছর বয়সী এই গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী এখনও কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন এবং তার স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ নেই।
মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিদো দীর্ঘদিন ধরেই রহস্যময় ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত শহর হিসেবে পরিচিত। ২০০৫ সালে সাবেক সামরিক শাসক থান শোয়ে রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শহরটি গড়ে তোলা হয়। বিশাল আয়তনের এই শহরে সরকারি ভবন, সামরিক স্থাপনা এবং আবাসিক এলাকা একে অপরের থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। ফলে শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রবেশাধিকারও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
সামরিকপন্থী ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) মুখপাত্র থেইন তুন উ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সু চির অবস্থান সম্পর্কে তার কোনো তথ্য নেই। তিনি বলেন, “সবাই তার অবস্থান জানতে পারে না। আমিও জানি না।”
নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক সূত্রও দাবি করেছে, সু চিকে এমন একটি এলাকায় রাখা হয়েছে যেখানে প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত। এমনকি অনেক সামরিক কর্মকর্তাও তার অবস্থান সম্পর্কে অবগত নন।
স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানের কন্যা অং সান সু চি ১৯৮৮ সালে দেশে ফিরে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। সামরিক শাসনের বিরোধিতা করায় তিনি দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নেতৃত্ব দিলেও ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়।
সু চির ছেলে কিম অ্যারিস বলেছেন, তার মাকে যে বাড়িতে রাখা হয়েছে, সেটিকে প্রকৃত অর্থে বাসভবন বলা যায় না। তার মতে, এটি আরেক ধরনের কারাগার, যেখানে তিনি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন।
এদিকে সামরিকপন্থী রাজনীতিকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সু চির রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে তিনি এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক এবং দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় তার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
সামরিক সরকারের দাবি অনুযায়ী অং সান সু চি বর্তমানে নেইপিদোতে গৃহবন্দি থাকলেও তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনও অজানা। ফলে দেশটির সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে রহস্য ও জল্পনা-কল্পনা অব্যাহত রয়েছে।
