নরওয়ের বিপক্ষে হার নিয়ে প্রশ্নের মুখে আনচেলত্তির পরিকল্পনা, হতাশ সমর্থকরা
বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল ব্রাজিল। কিন্তু শেষ ষোলোতেই তাদের স্বপ্ন থেমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রতিপক্ষের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ব্রাজিলের একাধিক কৌশলগত ও ব্যক্তিগত ভুলই তাদের বিদায়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নরওয়ের হয়ে দুই গোল করেন তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। অন্যদিকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি আসে নেইমারের পেনাল্টি থেকে। তবে ম্যাচজুড়ে ছন্দহীন ফুটবল, সুযোগ নষ্ট এবং পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা সেলেসাওদের বড় মূল্য দিতে বাধ্য করেছে।
ব্রাজিল ম্যাচের শুরু থেকেই তুলনামূলক রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নেয়। বলের দখল প্রতিপক্ষের হাতে ছেড়ে দিয়ে পাল্টা আক্রমণে গোলের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করে দলটি। কিন্তু এই কৌশল উল্টো নরওয়ের জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে।
ম্যাচের অধিকাংশ সময় নরওয়ে খেলার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। ফলে ব্রাজিল নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক পরিচয় তুলে ধরতে পারেনি।
প্রথমার্ধে গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেননি ব্রুনো গিমারেস। তার নেওয়া পেনাল্টি দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক ওরজান নাইল্যান্ড।
নকআউট ম্যাচে এমন সুযোগ হাতছাড়া হওয়া দলের আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরে ম্যাচের ফলাফলেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ব্রাজিলের ফরোয়ার্ডরা প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি। বদলি হিসেবে মাঠে নেমে এনদ্রিক একটি সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। অন্যদিকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কয়েকবার আক্রমণ গড়ে তুললেও শেষ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন।
ফলে গোলের সম্ভাবনাময় মুহূর্তগুলো কাজে লাগাতে পারেনি দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর গোলদাতা আর্লিং হালান্ডকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। দুটি গোলের ক্ষেত্রেই তিনি পর্যাপ্ত জায়গা ও সময় পেয়েছেন।
একটি গোল আসে হেড থেকে, অন্যটি দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে। দুই ক্ষেত্রেই ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারদের অবস্থান ও সমন্বয়ের ঘাটতি চোখে পড়ে।
নকআউট ম্যাচের চাপ সামলাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেননি। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে আত্মবিশ্বাসের অভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধা দেখা যায়।
নেইমারের শেষ মুহূর্তের গোল ব্যবধান কমালেও দলকে ম্যাচে ফেরানোর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ বিদায়ের আরেকটি বড় কারণ ছিল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো। ম্যাচে বলের দখল ছিল মাত্র ৩৭ শতাংশ।
কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারেসদের মতো অভিজ্ঞ মিডফিল্ডাররাও ম্যাচের গতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি। এর ফলে নরওয়ে সহজেই খেলার ছন্দ নির্ধারণ করেছে।
ম্যাচের আগে থেকেই নেইমারকে শুরুর একাদশে দেখার প্রত্যাশা ছিল সমর্থকদের। তবে কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাকে বেঞ্চে রেখে ম্যাচ শুরু করেন।
শেষদিকে মাঠে নেমে নেইমার গোল করলেও তখন ম্যাচের মোড় ঘোরানোর মতো পর্যাপ্ত সময় ছিল না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, শুরু থেকেই তিনি খেললে আক্রমণে সৃজনশীলতা ও অভিজ্ঞতার প্রভাব আরও বেশি দেখা যেতে পারত।
ব্রাজিলের বর্তমান স্কোয়াডে বিশ্বমানের একাধিক তারকা থাকলেও দলগত সমন্বয়, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং ম্যাচ ব্যবস্থাপনায় কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। নরওয়ের বিপক্ষে পরাজয় শুধু একটি ম্যাচ হার নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে থাকা একটি দলের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ টুর্নামেন্টে সফল হতে হলে ব্রাজিলকে কৌশলগত নমনীয়তা, মানসিক দৃঢ়তা এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা আরও উন্নত করতে হবে। অন্যদিকে ঐতিহাসিক এই জয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে।
