অনিয়মিত মাসিক, ওজন বৃদ্ধি ও হরমোনজনিত জটিলতা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত
ঢাকা: নারীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমানভাবে দেখা দেওয়া হরমোনজনিত সমস্যাগুলোর অন্যতম হলো পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস)। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বাড়ছে এবং সময়মতো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এটি বন্ধ্যাত্ব, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পিসিওএসে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, ডিম্বাশয়ে সিস্ট, ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা এবং প্রজননসংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে পিসিওএসের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। পরিবারে মা বা বোনের কারও এই সমস্যা থাকলে অন্য সদস্যদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বংশগত কারণের পাশাপাশি পরিবেশগত দূষণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তনও এ রোগের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, পিসিওএসের কয়েকটি সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে—
- মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা দীর্ঘ সময় মাসিক বন্ধ থাকা
- মুখমণ্ডল বা শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানো
- ব্রণ ও ত্বকের তৈলাক্ততা বৃদ্ধি
- অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি
- চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
- গর্ভধারণে সমস্যা
এ ছাড়া আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের আকার বৃদ্ধি বা একাধিক সিস্ট শনাক্ত করা গেলে রোগ নির্ণয়ে সহায়তা পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীর শারীরিক উপসর্গ, চিকিৎসা ইতিহাস এবং হরমোন পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে পিসিওএস শনাক্ত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষার মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয় এবং সেখান থেকেই চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসাহীন অবস্থায় থাকলে পিসিওএস নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে গর্ভধারণে জটিলতা এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ছাড়া স্থূলতা থাকলে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং হৃদ্রোগের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত ব্রণ, মুখে লোম এবং চুল পড়ার কারণে অনেক তরুণী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে উদ্বেগ ও হতাশায় ভুগতে পারেন।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় মাসিক না হলে জরায়ুর ভেতরের আবরণ (এন্ডোমেট্রিয়াম) অস্বাভাবিকভাবে পুরু হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই যেসব নারীর স্বাভাবিকভাবে মাসিক হয় না, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ এবং নিয়মিত ফলোআপে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, পিসিওএস পুরোপুরি নির্মূল করার কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও সঠিক জীবনধারা অনুসরণ করলে উপসর্গ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এ জন্য তারা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন—
- খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার রাখা
- সাদা ভাত, রুটি ও অতিরিক্ত পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কম খাওয়া
- নিয়মিত ব্যায়াম করা
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার, যোগব্যায়াম ও ধ্যানের মতো কার্যক্রম ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও বজায় রাখতে সহায়তা করে।
পিসিওএস এখন শুধু একটি হরমোনজনিত সমস্যা নয়, বরং নারীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই অনিয়মিত মাসিক, অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি বা অন্যান্য লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে এ রোগের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
