পুলিশ চৌকিতে হামলা, জিম্মি হত্যা ও সেনা কনভয়ে আক্রমণে উত্তপ্ত পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ
পাকিস্তানের অস্থির প্রদেশ বেলুচিস্তানে টানা কয়েক দিনের সহিংসতায় পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পুলিশ চৌকি, নিরাপত্তা বাহিনীর কনভয় এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় চার দিনের ব্যবধানে অন্তত ৯৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, বেসামরিক নাগরিক এবং অভিযানে নিহত বিদ্রোহীরাও রয়েছেন।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলাগুলো বেলুচিস্তানের জিয়ারত, লাসবেলা, খারান ও দালবান্দিন অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে। হামলার জবাবে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিক পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো সরকারি হতাহতের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সহিংসতার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে জিয়ারত জেলার মাঙ্গি ড্যাম এলাকায়। গভীর রাতে একটি পুলিশ চৌকিতে সমন্বিত হামলা চালায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা। দীর্ঘ সময় ধরে গোলাগুলির পর হামলাকারীরা চৌকিটির নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে জানায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।
প্রাথমিক হামলায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পাশাপাশি বহু সদস্যকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে উদ্ধার অভিযানের সময় অপহৃত ১৮ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, হামলার পর পরিচালিত অভিযানে বিভিন্ন স্থানে মোট ৫৪ জন সশস্ত্র সদস্য নিহত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়ারত এলাকায় পরিচালিত অভিযানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হামলাকারীকে হত্যা করা হয়েছে।
তবে বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।
জিয়ারতে অভিযান চলাকালেই লাসবেলা জেলার বেলা-উইন্ডার এলাকায় সেনাবাহিনীর একটি কনভয় হামলার মুখে পড়ে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযোগ, এই হামলার পেছনে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) জড়িত।
সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, হামলায় একজন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারসহ ১১ সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। পাল্টা অভিযানে বেশ কয়েকজন হামলাকারী নিহত হওয়ার দাবি করেছে সেনাবাহিনী। অন্যদিকে বিএলএ ভিন্ন তথ্য দিয়ে বলেছে, তাদের অভিযানে আরও বেশি সেনাসদস্য হতাহত হয়েছেন।
মাঙ্গি ড্যাম হামলার পর স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে হামলার পটভূমি, নিরাপত্তা ঘাটতি, গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয় নিয়ে তদন্তে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সহিংসতার ঘটনার পর পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব প্রতিবেশী ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, সীমান্তের বাইরে অবস্থানকারী গোষ্ঠীগুলো এসব হামলায় সহায়তা করছে এবং আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে কিছু সশস্ত্র সংগঠন পাকিস্তানে হামলা পরিচালনা করছে।
তবে ভারত এবং আফগানিস্তানের কর্তৃপক্ষ অতীতের মতো এবারও এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির দায় অন্য দেশের ওপর চাপানো সমাধান নয়।
প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রদেশে রাজনৈতিক অসন্তোষ, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত চলমান।
স্থানীয় সংগঠনগুলো রাজনৈতিক অধিকার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং জোরপূর্বক গুমের অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বেলুচিস্তানে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সামরিক অভিযান দিয়ে বেলুচিস্তানের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, উন্নয়ন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের আস্থার সংকট দূর করার উদ্যোগ ছাড়া সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলো পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। একদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান জোরদার হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্রোহী তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। ফলে বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর রাখছে পুরো অঞ্চল।
