শুধু ডিম্বাশয়ের সমস্যা নয়, হরমোন ও বিপাকীয় জটিলতার সমন্বিত চিত্র তুলে ধরতেই নতুন নামকরণের উদ্যোগ
বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে বহুল পরিচিত স্বাস্থ্যসমস্যা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)-এর নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী, গবেষক ও রোগী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল। নতুন প্রস্তাবিত নাম পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভেরিয়ান সিনড্রোম (PMOS)। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নামটি রোগটির প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ও জটিলতাকে আরও সঠিকভাবে তুলে ধরবে এবং রোগ নির্ণয় ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
দীর্ঘদিন ধরে PCOS নামে পরিচিত এই স্বাস্থ্যসমস্যাকে অনেকেই শুধুমাত্র ডিম্বাশয়ে সিস্ট তৈরির রোগ হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগে আক্রান্ত সব নারীর ডিম্বাশয়ে সিস্ট তৈরি হয় না। ফলে পুরোনো নামটি রোগের প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসাবিদদের মতে, PCOS নামের ‘সিস্টিক’ শব্দটি রোগটির একটি সীমিত উপসর্গকে গুরুত্ব দেয়, অথচ এটি মূলত হরমোনজনিত ও বিপাকীয় (Metabolic) একটি জটিল অবস্থা। অনেক রোগী বছরের পর বছর উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও সঠিক রোগ নির্ণয়ের বাইরে থেকে গেছেন, কারণ আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে সিস্ট না পাওয়ায় তারা এই রোগের আওতায় বিবেচিত হননি।
নতুন নাম PMOS-এর মাধ্যমে রোগটির বহুমাত্রিক প্রকৃতি তুলে ধরা হয়েছে। এখানে ‘পলিএন্ডোক্রাইন’ অংশটি শরীরের একাধিক হরমোন ব্যবস্থার সম্পৃক্ততা নির্দেশ করে, ‘মেটাবলিক’ শব্দটি ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা ও হৃদ্রোগজনিত ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আনে এবং ‘ওভেরিয়ান’ অংশটি ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতার সঙ্গে এর সম্পর্ককে ধরে রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, PMOS আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর ফলে শরীরের শক্তি ব্যবস্থাপনা এবং হরমোন নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
এই অবস্থার কারণে অনেকের মধ্যে ক্লান্তি, দ্রুত ওজন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত খাদ্যাভ্যাস, ব্রণ, অনিয়মিত ঋতুচক্র, মুখমণ্ডলে অবাঞ্ছিত লোম গজানো এবং মাথার চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এই রোগকে কেবল প্রজনন বা বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যা হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। ফলে এর বিপাকীয় ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো অনেক সময় আড়ালেই থেকে গেছে।
চিকিৎসা বিশ্লেষকদের ধারণা, নাম পরিবর্তনের ফলে রোগটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বোঝাপড়া আরও বিস্তৃত হবে। এতে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং জীবনযাত্রাভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় নতুন গুরুত্ব তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, নতুন নাম রোগটির চিকিৎসা পদ্ধতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন না আনলেও এটি রোগ সম্পর্কে সামাজিক ও চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনার ধরন বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে ঋতুচক্র বা সন্তান ধারণের সক্ষমতার বাইরে গিয়ে পুরো শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
নারীর স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে PMOS নামকরণকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একটি রোগের নাম কখনও কখনও রোগ সম্পর্কে মানুষের ধারণা, চিকিৎসা গ্রহণের মানসিকতা এবং স্বাস্থ্যনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে।
তাই PCOS থেকে PMOS-এ রূপান্তর কেবল নামের পরিবর্তন নয়; এটি নারীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও বৈজ্ঞানিক, বিস্তৃত এবং বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
বিশ্বব্যাপী লাখো নারীকে প্রভাবিত করা এই স্বাস্থ্যসমস্যার নতুন নাম PMOS রোগটির প্রকৃত জটিলতাকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। বিশেষজ্ঞদের আশা, নতুন এই পরিচয় রোগ নির্ণয়ের বিভ্রান্তি কমাবে, সচেতনতা বাড়াবে এবং নারীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আরও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করবে।
