পাঁচ উপজেলায় বন্যার প্রকোপ, আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ; দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে হিমশিম প্রশাসন
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটি জেলার বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। জেলার অন্তত পাঁচটি উপজেলা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বহু ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও তীব্র স্রোত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক স্থানে এখনো ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি এবং নানিয়ারচর উপজেলায় বন্যার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উজান এলাকা থেকে নেমে আসা পানির চাপ এবং অব্যাহত বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা বন্যার পানিতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাংক্ষ্যং নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ফারুয়া বাজার পুরোপুরি প্লাবিত হয়েছে। শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পানির নিচে চলে গেছে এবং অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
তক্তানালা, ওড়াছড়ি, যমুনাছড়ি, শুক্করছড়ি, চাইন্দা, আলেচং, ঝাংবিল, উলুছড়ি, তাড়াছড়ি, গোয়াইনছড়ি পাড়া ও আশপাশের আরও কয়েকটি এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।
পাহাড়ি ঢলের কারণে রাজস্থলী-বিলাইছড়ি সীমান্ত সড়কের একটি অংশ ধসে পড়েছে। ফলে ওই রুটে বড় ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে ত্রাণ সরবরাহ এবং জরুরি সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রাঙামাটি জুড়ে ৫১টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ইতোমধ্যে চার হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে বন্যার পানি অব্যাহত থাকায় আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বন্যাকবলিত এলাকায় শিশু, নারী ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বাঘাইছড়িসহ বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। নৌকা ও স্পিডবোট ব্যবহার করে দুর্গত পরিবারের কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে প্রবল স্রোত এবং জলাবদ্ধতার কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন জানিয়েছেন, পানির স্রোত অত্যন্ত তীব্র হওয়ায় কিছু দুর্গম এলাকায় আপাতত ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত সেখানে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া মানুষদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পাহাড়ি এলাকায় ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটির বন্যা শুধু জনজীবন নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। কৃষিজমি, মাছের খামার, ছোট ব্যবসা এবং পরিবহন খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে রাঙামাটির বন্যা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। হাজারো পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে এবং অনেক এলাকায় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত না হলে মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
