বৃহস্পতির চেয়েও ভারী কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে কম ঘনত্বের গ্রহ শনাক্ত, নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে গবেষণা
মহাকাশের অজানা জগৎ নিয়ে গবেষণায় নতুন এক চমকপ্রদ আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। বিশাল আকারের হলেও তুলনামূলকভাবে কম ঘনত্বের দুটি বিরল গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোকে গবেষকরা ‘দানবীয়’ এবং অনেকটা ‘ফাঁপা’ প্রকৃতির বলে বর্ণনা করছেন। এই আবিষ্কার বহির্গ্রহ (এক্সোপ্ল্যানেট) অনুসন্ধানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট (টেস) ব্যবহার করে দূরবর্তী এক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান গ্রহটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষত্ব হলো, প্রচলিত পদ্ধতিতে নয়; বরং মহাকর্ষীয় প্রভাবভিত্তিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই গ্রহের সন্ধান মিলেছে।
সাধারণত টেস স্যাটেলাইট এমন গ্রহ খুঁজে বের করে, যেগুলো তাদের নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। কিন্তু নতুন শনাক্ত হওয়া গ্রহটি নিজ নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে এবং বৃহস্পতির মতো দীর্ঘ কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করেছে যে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের পুরোনো তথ্যভাণ্ডারেও এখনো বহু অজানা গ্রহের অস্তিত্ব লুকিয়ে থাকতে পারে, যা আগে গবেষণার আওতায় আসেনি।
২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার গায়া স্পেস টেলিস্কোপ একটি অস্বাভাবিক আলোক বিচ্ছুরণের ঘটনা শনাক্ত করে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, একটি নক্ষত্র হঠাৎ করে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
পরে বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করে দেখেন, এটি ছিল ‘গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেনসিং’ নামে পরিচিত একটি মহাজাগতিক ঘটনা। কোনো নক্ষত্র অন্য একটি দূরবর্তী নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় তার মহাকর্ষীয় প্রভাব পেছনের নক্ষত্রের আলোকে বড় করে দেখায়। এই প্রক্রিয়াই দূরবর্তী গ্রহ শনাক্তে সহায়তা করে।
এরপর গবেষকরা টেস স্যাটেলাইটের সংরক্ষিত পুরোনো তথ্য বিশ্লেষণ করে একই ঘটনার রেকর্ড খুঁজে পান এবং গ্রহটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন।
গবেষণায় শনাক্ত হওয়া ‘গায়া-২৩ব্রা বি’ নামের গ্রহটির ভর বৃহস্পতির তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৬ গুণ বেশি। এটি একটি কমলা বর্ণের বামন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে, যার ভর সূর্যের প্রায় ৮০ শতাংশ।
গ্রহটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। তুলনামূলকভাবে টেস স্যাটেলাইট সাধারণত পৃথিবীর কাছাকাছি কয়েকশ আলোকবর্ষ দূরত্বের গ্রহ শনাক্ত করে থাকে। তাই এত দূরের গ্রহ শনাক্ত হওয়াকে গবেষকরা একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন।
নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডায়ানা ড্রাগোমির বলেন, টেস স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সময় কেউ কল্পনাও করেননি যে এটি এ ধরনের দূরবর্তী ও বিরল বৈশিষ্ট্যের গ্রহ শনাক্ত করতে পারবে।
তার মতে, এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মহাকাশ গবেষণার পুরোনো ডেটা পুনঃবিশ্লেষণ করলে ভবিষ্যতে আরও বহু অজানা গ্রহের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেনসিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূরবর্তী গ্রহ অনুসন্ধান ভবিষ্যতে আরও গতিশীল হবে। বিশেষ করে প্রচলিত পদ্ধতিতে শনাক্ত করা সম্ভব নয়—এমন গ্রহ খুঁজে বের করতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মহাবিশ্বের গঠন, গ্রহের উৎপত্তি এবং সৌরজগতের বাইরের জগত সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা অর্জনের ক্ষেত্রেও এই ধরনের আবিষ্কার মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করবে।
মহাকাশে আবিষ্কৃত নতুন এই ‘দানবীয়’ গ্রহ শুধু একটি নতুন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু নয়; বরং এটি বহির্গ্রহ অনুসন্ধান প্রযুক্তির সক্ষমতা এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে একই ধরনের আরও অনেক বিস্ময়কর আবিষ্কার মহাকাশবিজ্ঞানের নতুন অধ্যায় রচনা করবে।
