আসক্তি তৈরির অভিযোগে অটোপ্লে ও ইনফিনিট স্ক্রল ফিচার নিয়ে কড়া অবস্থানে ইউরোপীয় কমিশন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখার অভিযোগে মেটার মালিকানাধীন ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ এনেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপীয় কমিশন বলছে, প্ল্যাটফর্ম দুটির কিছু নকশাগত বৈশিষ্ট্য ব্যবহারকারীদের, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আসক্তি তৈরির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব ফিচারে পরিবর্তন না আনলে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে পারে প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা।
শুক্রবার প্রকাশিত কমিশনের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের অটোপ্লে, ইনফিনিট স্ক্রল এবং অতিমাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক কনটেন্ট সুপারিশ ব্যবস্থা ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার জন্য কাজ করে, যা ডিজিটাল সুস্থতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (ডিএসএ) আইনের আওতায় প্রায় দুই বছর ধরে পরিচালিত তদন্তের পর এই অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিএসএ অনুযায়ী, বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্ট এবং ব্যবহারজনিত নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হয়।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের রিলস, স্টোরিজ এবং কনটেন্ট রিকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত সময় প্ল্যাটফর্মে ব্যয় করতে উৎসাহিত করে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বা নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, মনোযোগ ক্ষমতা এবং অনলাইন আসক্তির বিষয়টি এখন নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ইইউর মতে, মেটা ঝুঁকি কমাতে কিছু পদক্ষেপ নিলেও সেগুলো যথেষ্ট কার্যকর নয়। সময় ব্যবস্থাপনার টুল সহজেই উপেক্ষা করা যায় এবং অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হয়।
ইউরোপীয় কমিশন মেটাকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ডিফল্টভাবে অটোপ্লে বন্ধ রাখা
- ইনফিনিট স্ক্রল সীমিত বা নিষ্ক্রিয় করা
- কার্যকর স্ক্রিন-টাইম বিরতি চালু করা
- ব্যবহারকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরিবর্তে সুস্থ ব্যবহারকে গুরুত্ব দিয়ে অ্যালগরিদম পুনর্গঠন করা
কমিশনের প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান হেনা ভিরকুনেন বলেছেন, বর্তমান নকশা অতিমাত্রায় আসক্তিমূলক বলে তাদের মূল্যায়নে উঠে এসেছে এবং এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
মেটার মুখপাত্র বেন ওয়াল্টার্স অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। তার দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে কিশোর ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় কোম্পানির গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
মেটার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ইতোমধ্যে ‘টিন অ্যাকাউন্ট’ সুবিধা চালু করেছে, যার মাধ্যমে অভিভাবকরা শিশুদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এছাড়া রাতের নির্দিষ্ট সময়ে অ্যাক্সেস সীমিত করা এবং দৈনিক স্ক্রিন-টাইম সীমা নির্ধারণের সুযোগও রাখা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন অনুযায়ী, অভিযোগ প্রমাণিত হলে মেটাকে তাদের বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।
বর্তমানে কোম্পানিটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরপর কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে।
একই সময়ে ইউরোপীয় কমিশন কিশোর-কিশোরীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নতুন বিধিনিষেধের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইউরোপজুড়ে নির্দিষ্ট বয়সের নিচের ব্যবহারকারীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ সীমিত করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের মধ্যে ইইউর এই পদক্ষেপ প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিতে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
