সরবরাহ শৃঙ্খলের বিকল্প গড়তে কয়েক দশকজুড়ে লাগবে বিপুল বিনিয়োগ, বলছে নতুন বিশ্লেষণ
বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের প্রভাব কমানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে পশ্চিমা দেশগুলোকে আগামী কয়েক দশকে বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হবে। নতুন এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোজোন ও যুক্তরাজ্যের সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন হতে পারে ২৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই-পার্থেননের গবেষণায় উঠে এসেছে, উৎপাদন, প্রযুক্তি, গবেষণা, সফটওয়্যার অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির সবচেয়ে বড় ব্যয়ভার বহন করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। দেশটির জন্য সম্ভাব্য অতিরিক্ত বিনিয়োগের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ইউরোজোনের জন্য এ ব্যয় প্রায় ৯ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাজ্যের জন্য প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার।
গবেষণা অনুযায়ী, আগামী ২৫ বছরে তিন অঞ্চলের সম্মিলিতভাবে বছরে গড়ে অতিরিক্ত ৯৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হতে পারে। এই অর্থ জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে বিদ্যমান বিনিয়োগের বাইরের অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই প্রতি বছর প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতে পারে। তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশটির বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা সেন্টার নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় করেছিল, এই অঙ্ক তার কাছাকাছি। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় বর্তমান বার্ষিক বাজেটের প্রায় দ্বিগুণের সমান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। কারণ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে গেলে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত করদাতা ও ভোক্তাদের ওপর পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানোই তুলনামূলক বাস্তবসম্মত কৌশল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ উদ্যোগের ব্যয়ও বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু অর্থ বিনিয়োগ করলেই পশ্চিমা দেশগুলোর লক্ষ্য পূরণ হবে না। কারণ বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন, ব্যাটারি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি এবং উন্নত উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের বড় অংশ এখনো চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আগামী দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের অধিকাংশ পরিশোধিত লিথিয়াম, কোবাল্ট, ব্যাটারি-গ্রেড গ্রাফাইট এবং বিরল খনিজ সরবরাহে চীনের প্রভাবশালী অবস্থান বজায় থাকবে। ফলে বিকল্প উৎস গড়ে তোলা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং শুল্কসংক্রান্ত বিরোধ সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি সম্পর্কে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গত বছর বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ে চীনের কিছু পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শিল্পখাতে সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যাঘাতের আশঙ্কা দেখা দেয়। এরপর থেকেই বিকল্প সরবরাহ উৎস এবং কৌশলগত খনিজ মজুদ গঠনের উদ্যোগ জোরদার করেছে বিভিন্ন দেশ।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীনে উৎপাদিত বহু পণ্যের কারখানা পর্যায়ের খরচ অন্যান্য দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে উৎপাদন কেন্দ্র অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপের শিল্পখাতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে কঠিন করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা শুধু অর্থের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রযুক্তি, কাঁচামাল, দক্ষ জনবল, শিল্পনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। তাই পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য এটি হবে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল একটি রূপান্তর প্রক্রিয়া।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় চীনের বিকল্প তৈরি করতে চাইলে পশ্চিমাদের শুধু বিপুল বিনিয়োগই নয়, কয়েক দশকব্যাপী সমন্বিত কৌশলও গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
