দেশে ৫৭ হাজার কোটি ও বিদেশে ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের আদেশে জব্দ, সম্পদ উদ্ধারে আশাবাদী আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং দেশের শীর্ষ ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলমান আর্থিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দেশে ও বিদেশে মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটির দাবি, আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে এসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সংস্থাটির প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন এ তথ্য তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বিএফআইইউ প্রধান জানান, জব্দ হওয়া সম্পদের মধ্যে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ দেশের অভ্যন্তরে রয়েছে। এছাড়া বিদেশে থাকা আরও ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদও আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ করা হয়েছে।
তবে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কত পরিমাণ সম্পদ জব্দ হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তের স্বার্থে এ ধরনের তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাঁর পরিবার এবং কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি, অর্থ পাচার, কর ও শুল্ক ফাঁকিসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়।
অনুসন্ধানের আওতায় থাকা শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ এবং আরামিট গ্রুপ।
এই অনুসন্ধান কার্যক্রমে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কাজ করছে। পুরো তদন্ত কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে বিএফআইইউ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আর্থিক লেনদেন, সম্পদের উৎস, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং কর সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, বিদেশে সরিয়ে নেওয়া সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এসব সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সম্পদ উদ্ধারের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির খবর পাওয়া যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনই তদন্তের মূল ভিত্তি।
তিনি বলেন, যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বর্তমান বা সাবেক সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় অঙ্কের সম্পদ জব্দ এবং অর্থ পাচারবিরোধী অনুসন্ধান দেশের আর্থিক খাতের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য দীর্ঘ আইনি ও আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
দেশে ও বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দের তথ্য বাংলাদেশের আর্থিক খাতে আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না এলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তৎপরতা অর্থ পাচার ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে নতুন গুরুত্ব দিচ্ছে। এখন নজর থাকবে জব্দকৃত সম্পদের আইনি নিষ্পত্তি এবং বিদেশে থাকা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতির দিকে।
