২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন ঘটনায় আলোচনায় আসা সাতজন আন্দোলনকারীর জীবন দুই বছর পর অনেকটাই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে। তবে আন্দোলনের লক্ষ্য ও প্রত্যাশা বাস্তবায়নের বিষয়ে তাঁদের অধিকাংশই হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, সরকার পরিবর্তন ও ভোটাধিকারের পরিবেশ ফিরে এলেও রাষ্ট্র সংস্কার, আইনের শাসন, দুর্নীতি দমন এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়।
ঢাকা, ১৯ জুলাই ২০২৬:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তোলা কয়েকটি ছবি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এসব ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্ররা আজ কোথায় এবং কী ভাবছেন—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো।
বৃষ্টিভেজা স্লোগানের প্রতীক শায়লা
২০২৪ সালের ২ আগস্ট রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমর্থনে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন কলেজটির সাবেক শিক্ষার্থী শায়লা আক্তার শশী। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে রিকশায় বসে স্লোগান দেওয়ার তাঁর একটি ছবি সে সময় ব্যাপক আলোচিত হয়।
বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শায়লা জানান, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ তাঁকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছিল। তাঁর ভাষায়, “পুরো কলেজ প্রাঙ্গণ স্লোগানে মুখর ছিল। এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি। স্লোগানের মধ্যে এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম যে কেউ ছবি তুলছে, সেটিও খেয়াল করিনি।”
তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি হতাশ। তাঁর মতে, আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না।
টিনের ঢাল হাতে পুলিশের সামনে নাসির
সরকার পতনের আগের দিন ৪ আগস্ট কারওয়ান বাজার এলাকায় টিনের তৈরি একটি অস্থায়ী ঢাল হাতে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্যানিটারি মিস্ত্রি মো. নাসির খান। সেই ছবি আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
নাসির জানান, সোনারগাঁও হোটেলের পাশে একটি অস্থায়ী বেড়া থেকে টিন খুলে তা দিয়ে ঢাল তৈরি করেছিলেন। পরে পুলিশের গুলিতে তিনি কপাল ও হাতে ছররাবিদ্ধ হন।
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যখন সাধারণ মানুষের আন্দোলনে রূপ নেয় এবং মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হতে দেখি, তখন বিবেকের তাড়নায় রাস্তায় নেমেছিলাম। সেদিন আন্দোলনে অংশ না নিলে সারাজীবন আফসোস থাকত।”
নাসিরের অভিযোগ, আহত আন্দোলনকারীদের তালিকায় তাঁর নাম নেই। তবে তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সরকারকে আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন।
গুলিবিদ্ধ রায়হানের নতুন পথচলা
১৯ জুলাই উত্তরা পূর্ব থানার সামনে পুলিশের গুলিতে আহত হন রায়হান মোল্লা। সড়ক বিভাজকের আড়ালে আশ্রয় নেওয়া অবস্থায় তাঁর ছবি সে সময় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে ব্যবসার পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের কাজ করছেন রায়হান। তিনি জানান, পুলিশের সঙ্গে আলোচনার সময় প্রথম গুলিটি তাঁর দিকেই ছোড়া হয়েছিল।
রায়হানের মতে, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি ও বৈষম্য হ্রাস এবং সবার সমান অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের মূল চেতনা পূর্ণতা পাবে না।
মুখ চেপে ধরা ছবির নাহিদুল
৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে হাইকোর্ট এলাকার মাজার গেটের সামনে আটক হন মো. নাহিদুল ইসলাম। আটকের সময় তাঁর মুখ চেপে ধরার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।
নাহিদুল বর্তমানে নাট্য নির্মাণে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, পুলিশের এক কর্মকর্তা তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। প্রতিবাদ জানালে তাঁর মুখ চেপে ধরা হয় এবং পরে আইনজীবীদের সহায়তায় মুক্তি পান।
দুই বছর পর আন্দোলনের মূল্যায়নে নাহিদুলের মত, যেমন মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে রাজনৈতিকভাবে একক মালিকানায় নেওয়ার চেষ্টা আওয়ামী লীগের পতনের কারণ হয়েছিল, তেমনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় এর লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুলিশের গাড়ির সামনে দাঁড়ানো নুসরাত
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান ৩১ জুলাইয়ের ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে এক শিক্ষার্থীকে আটকের প্রতিবাদে পুলিশের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যান। তাঁর সেই প্রতিবাদের ছবি আন্দোলনের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্যে পরিণত হয়।
নুসরাত বলেন, “অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই দাঁড়িয়েছিলাম। এরপর কী হবে, তা ভাবার সুযোগ ছিল না।”
তাঁর মতে, সরকার পরিবর্তন ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নারীর নিরাপত্তা এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
ভাইয়ের মরদেহ কাঁধে নিয়ে মিছিল
৫ আগস্ট নিহত ইসমাইল হোসেন রাব্বির মরদেহ কাঁধে নিয়ে চানখাঁরপুলে মিছিল করেছিলেন তাঁর দুই বোন মিতু আক্তার ও মিম আক্তার। সেই ছবি আন্দোলনের অন্যতম স্মরণীয় প্রতীকে পরিণত হয়।
বর্তমানে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে কর্মরত মিম আক্তার বলেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে তাঁর প্রত্যাশা হলো শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং চাঁদাবাজি ও মব সংস্কৃতি দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
ছাত্রলীগের হামলার মুখে লামিয়া
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার সময় আরেক শিক্ষার্থীর হাত ধরে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন লামিয়া রায়হান। সেই মুহূর্তের ছবি ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।
ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী লামিয়া জানান, হামলার মুখে আতঙ্কিত এক শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়ানোর সময়ই ছবিটি তোলা হয়েছিল।
তাঁর অভিযোগ, গত দুই বছরে বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁর ছবি ব্যবহার করা হলেও তাঁকে কখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। পাশাপাশি তিনি মনে করেন, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তার বড় অংশ এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।
অর্জনের স্বীকৃতি, প্রত্যাশার অপূর্ণতা
আলোচিত এসব আন্দোলনকারীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও তাঁদের প্রত্যাশা ছিল এক—বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে তাঁরা একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দেখলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি বলে মনে করেন।
তাঁদের অভিন্ন প্রত্যাশা, শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই হবে, যখন দেশে আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
