স্মার্ট রিং ও ফিটনেস ট্র্যাকার ব্যবহার করে গর্ভধারণের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার দাবি করছেন অনেক নারী। এমনকি কেউ কেউ বলছেন, এসব ডিভাইস গর্ভপাতের সম্ভাব্য সংকেতও আগেভাগে ধরতে সাহায্য করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন এবং অতিরিক্ত নির্ভরতা মানসিক উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ৩৪ বছর বয়সী সলিসিটর রাভিকা জন্মদিন উপলক্ষে স্বামীর সঙ্গে ছুটিতে ছিলেন, যখন তাঁর ওউরা (Oura) রিং একটি অস্বাভাবিক সতর্কবার্তা দেয়। ডিভাইসটির তথ্যে দেখা যায়, তাঁর হার্ট রেট বেড়েছে, শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি (HRV) কমে গেছে। অথচ তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থই অনুভব করছিলেন।
এক সপ্তাহ পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় তিনি অনলাইনে খোঁজ নিতে শুরু করেন। সেখানে এমন নারীদের একটি কমিউনিটির সন্ধান পান, যারা দাবি করেছিলেন যে তাদের ফিটনেস ট্র্যাকার গর্ভধারণের ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিল। এর এক সপ্তাহ পর রাভিকার গর্ভধারণ পরীক্ষার ফল ইতিবাচক আসে।
গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর পেটে ব্যথা এবং শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপের ইঙ্গিত দেওয়া একটি নোটিফিকেশন পাওয়ায় তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক তাঁকে ১০ দিন পর পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন, যাতে গর্ভাবস্থা সুস্থভাবে এগোচ্ছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
এই অপেক্ষার সময় রাভিকা নিয়মিত তাঁর ফিটনেস ট্র্যাকারের তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে অ্যাপ রিফ্রেশ করে দেখতেন তাপমাত্রা ও অন্যান্য সূচক স্বাভাবিক আছে কি না। একপর্যায়ে এসব তথ্য তাঁর কাছে “আসক্তির” মতো হয়ে দাঁড়ায়।
৩২ বছর বয়সী সোফিয়া নামের আরেক নারী জানিয়েছেন, তিনি তাঁর ওউরা রিংয়ের তথ্য দেখে দুটি গর্ভপাতের আগাম ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। প্রথমবার গর্ভবতী হওয়ার পর তিনি প্রতিদিন শরীরের তাপমাত্রার গ্রাফ পর্যবেক্ষণ করতেন। একদিন হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়ার বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। পরে তাঁর গর্ভপাত হয়।
সোফিয়ার ভাষায়, “যখন গর্ভপাত হলো, তখন আমি মানসিকভাবে কিছুটা প্রস্তুত ছিলাম, কারণ আগেই ডেটায় পরিবর্তন দেখেছিলাম।”
তিন মাস পর একই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটে। পরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার সময় আবারও রিংয়ে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চাপের লক্ষণ দেখতে পান। পরীক্ষা করে জানতে পারেন, তিনি আবার গর্ভবতী হয়েছেন। এবার গর্ভাবস্থা সুস্থভাবেই এগিয়েছে এবং বর্তমানে তাঁর পাঁচ মাস বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।
ফিটনেস ট্র্যাকার, স্মার্ট রিং এবং স্মার্ট ঘড়ির ব্যবহার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বেড়েছে। ইউগভ (YouGov)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের ৩৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ফিটনেস ট্র্যাকার ব্যবহার করতেন, যা ২০১৯ সালের জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভধারণের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ হলো শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন। যেসব ডিভাইস শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে পারে, সেগুলো এই পরিবর্তন আগেভাগে শনাক্ত করতে সক্ষম। সাধারণত মাসিক চক্রের শেষে শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়, কিন্তু গর্ভধারণের শুরুতে তা উঁচু অবস্থায় থেকে যায়।
লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালের প্রজনন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডা. স্টুয়ার্ট ল্যাভারি বলেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রযুক্তির সাহায্যে যত দ্রুত সম্ভব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে চায়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আরও অনেক তথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন। তা না হলে উদ্বেগের মাত্রা হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ অ্যাপ ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে এ ধরনের তথ্য জানার চেষ্টা করবেন, কিন্তু এসব তথ্যের নির্ভুলতা সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।
অন্যদিকে ওউরার নারীস্বাস্থ্যবিষয়ক ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ডা. ক্রিস কারি বলেন, গর্ভাবস্থা এমনিতেই অনেক নারীর জন্য অনিশ্চয়তার সময়। তিনি জানান, কেউ যদি অতিরিক্ত উদ্বেগে ভোগেন, তাহলে কিছু সময়ের জন্য অ্যাপ ব্যবহার থেকে বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তাঁর ভাষায়, “রিং একটি সহায়ক উপকরণ, এটি চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা দলের বিকল্প নয়।”
রাভিকার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। তবে তিনি ভবিষ্যতে আবার সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে আশা করছেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, পরবর্তীবার গর্ভধারণের আভাস পেলে ফিটনেস ট্র্যাকারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করাই তাঁর জন্য ভালো হবে।
প্রযুক্তি স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ফিটনেস ট্র্যাকারের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
