যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ ও অঞ্চলের পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ ‘জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক’ (Forced Labor Tariff) আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) বলছে, পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত অগ্রগতি দেখাতে না পারায় ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন শুল্ক অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্য ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় পড়বে। তবে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য এ শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে এবং ভবিষ্যতে শর্তসাপেক্ষে ‘ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ)’ সুবিধাও চালুর সম্ভাবনা রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) জোরপূর্বক শ্রম বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে প্রতারণা, ভয়ভীতি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ২ কোটি ৭৬ লাখ মানুষ জোরপূর্বক শ্রমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ ঘটনা বেসরকারি খাতে ঘটে এবং এর মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ২৩৬ বিলিয়ন ডলার অবৈধ মুনাফা অর্জিত হয়।
বাংলাদেশ আইএলওর সংশ্লিষ্ট শ্রম প্রোটোকল অনুমোদন করলেও ইউএসটিআরের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) আওতায় থাকা বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
চলতি বছরের মার্চে ইউএসটিআর বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ ও অঞ্চলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের লক্ষ্য ছিল, এসব দেশে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি রোধে আইন ও নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর, তা মূল্যায়ন করা।
তদন্ত শেষে প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, জনমত, সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ, উপদেষ্টা কমিটির মতামত এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইউএসটিআরের প্রধান জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, “আজকের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অন্যায্য বাণিজ্য পদ্ধতির সংশোধন শুরু করবে। এটি শ্রমিকদের কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য জরুরি।”
ইউএসটিআরের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী প্রায় ৮৫ ধরনের পণ্য নতুন শুল্কের বাইরে থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- নির্দিষ্ট কিছু শুকনো উদ্ভিজ্জ উপাদান
- ইসবগুলের ভুসি
- কিছু ভেষজ নির্যাস
- বাঁশের তৈরি পণ্য
- ক্যাস্টর অয়েল
- নির্দিষ্ট ধরনের সেগুন ও মেহগনি কাঠের পণ্য
- কিছু সিল্ক ফ্যাব্রিক
- নির্দিষ্ট রত্নপাথর
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন শুল্কে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে। তবে ইউএসটিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশ যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন তুলা ও টেক্সটাইল কাঁচামাল আমদানি করে, তাহলে ভবিষ্যতে ‘ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ)’ সুবিধার আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির সুযোগ পেতে পারে।
এই সুবিধা চালু না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, তুরস্ক ও ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্ক প্রতিযোগী কয়েকটি দেশের তুলনায় কম হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় থাকবে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বরাতে মন্ত্রণালয় জানায়, চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর বেশি হারে শুল্ক আরোপ হওয়ায় বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এটি মূলত পূর্বঘোষিত ১০ শতাংশ শুল্কের নতুন নামে পুনর্বহাল। ফলে বাস্তবে কোনো অতিরিক্ত শুল্কের বোঝা সৃষ্টি হয়নি।
দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমদানিকৃত পণ্যের ওপর একাধিক শুল্কনীতি গ্রহণ করেন। তবে আইনি জটিলতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট অতিরিক্ত শুল্কের বড় একটি অংশ বাতিল করে দেয়।
এরপর ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা ব্যবহার করে ‘জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক’ কার্যকর করার পথ বেছে নেয়।
দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, আদালতের রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলার ফেরত দিতে হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাজেট ঘাটতি বেড়ে ১ দশমিক ৩৬৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন শুল্ক থেকে অর্জিত রাজস্বের মাধ্যমে সেই ঘাটতির একটি অংশ পূরণের লক্ষ্যও প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পেছনে কাজ করছে।
