কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি কার্গো জাহাজে ইউক্রেনের হামলার অভিযোগ ঘিরে তেহরান ও কিয়েভের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এতদিন পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দুই অঞ্চলকে আরও সরাসরি সামরিক উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি একটি কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই হামলার মাধ্যমে ইরান ও ইউক্রেনের মধ্যকার উত্তেজনা বেড়েছে এবং দুই দেশের পরোক্ষ সংঘাত সরাসরি সামরিক মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের দাবি, হামলার শিকার জাহাজটি ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে তেহরান বলছে, এটি ছিল একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। হামলায় একজন নাবিক নিহত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছে ইরান।
ঘটনার পর ইরানের কর্মকর্তারা প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এর জবাবে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ কার্যক্রমে সহায়তা দিয়ে ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ভূমিকা নেওয়ার নৈতিক অধিকার নেই।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো ইরানের তৈরি দূরপাল্লার ড্রোন, যা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর কয়েক মাস পর থেকেই এসব ড্রোন ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলায় ব্যবহৃত হতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান রাশিয়াকে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সরবরাহ করেছে। ইউক্রেন আরও দাবি করেছে, রুশ সেনাদের ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিতে ইরানি প্রশিক্ষকরাও সহায়তা করেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান।
কম খরচে ব্যবহারের উপযোগী এসব ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের কৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি উন্নয়নে বাধ্য করেছে, যা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে ইউক্রেন, তা এখন মধ্যপ্রাচ্যে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে কিয়েভ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। ইউক্রেন এই পরিস্থিতিকে নিজেদের ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি প্রদর্শন ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে দেখছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মার্চ মাসে জানিয়েছিলেন, ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় সহায়তা দিতে ২০০ জনের বেশি ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে।
তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, ইরানি শাসনের সন্ত্রাস যেন প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে সফল না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছে।
ইউক্রেন ইতোমধ্যে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি করেছে।
ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, রাশিয়া ও ইরান নিজেদের স্বার্থে একে অপরকে সহায়তা করছে। কিয়েভের অভিযোগ, দুই দেশের সহযোগিতা তাদের নিজ নিজ যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
শনিবার জেলেনস্কি দাবি করেন, ইউক্রেনের গোয়েন্দারা এমন তথ্য পেয়েছে যে, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির স্যাটেলাইট নজরদারি তথ্য ইরানকে সরবরাহ করছে রাশিয়া। এসব তথ্য ব্যবহার করে তেহরান হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জেলেনস্কি জানান, এসব তথ্য পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে ইউক্রেন।
এরপরই কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। কিয়েভের দাবি, জাহাজটি ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন করছিল। তবে সরঞ্জাম কোন পথে বা কোথায় নেওয়া হচ্ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানি জাহাজে হামলার ঘটনা ব্যবহার করে জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন যে, ইউক্রেন ও ওয়াশিংটনের প্রতিপক্ষ একই। পাশাপাশি তিনি আরও সামরিক সহায়তা, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরতে পারেন।
মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জাহাজে হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তিনি দাবি করেন, এটি জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ইউরোপকে সংঘাতে জড়ানোর উদ্দেশ্যে ইসরায়েলের নির্দেশে এ হামলা চালানো হয়েছে।
আরাগচি জানান, এ বিষয়ে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এই হামলার জবাব দেওয়া হবে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
