ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের লক্ষ্য করে ইরাকে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এতে অন্তত ২০ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হওয়ার দাবি করেছে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)। এর কয়েক ঘণ্টা আগে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি সামনে আসে। ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের বিভিন্ন এলাকায় যৌথ হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরিচালিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলায় জড়িত গোষ্ঠীগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
এর আগে সেন্টকম জানায়, মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাতের দিকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর আকস্মিক হামলার উদ্দেশ্যে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে (২১:৪৫ জিএমটি) চালানো ওই হামলার সব ক্ষেপণাস্ত্রই সফলভাবে প্রতিহত করা হয়।
অন্যদিকে, আইআরজিসি দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের “আগ্রাসনের” জবাবে জর্ডানে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি ও একটি কমান্ড সেন্টারে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী জাহাজকেও লক্ষ্য করে হামলার দাবি করে তারা। তাদের অভিযোগ, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে জাহাজগুলো একটি “অবৈধ ও অনিরাপদ” নৌপথ ব্যবহার করছিল।
জর্ডানে হামলার বিষয়ে ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, “We’ll be hitting them hard. They’re going to get a beating.”
সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৭২ ঘণ্টায় আইআরজিসি-সমর্থিত ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার জবাবে পূর্ব ইরাকের একাধিক অস্ত্র ও রসদ সংরক্ষণাগারে এই যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ড্রোন হামলাগুলো ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়, ভবিষ্যতে এমন হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র আরও সামরিক পদক্ষেপ নেবে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেন, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো সোমবার ও মঙ্গলবার ইরাক থেকে ড্রোন উড়িয়ে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল ও রিয়াদ অঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। তিনি বলেন, আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে।
তার ভাষায়, “সৌদি আরব উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তবে দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দৃঢ়ভাবে দেওয়া হবে।”
বুধবার সকালে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস জানায়, বাগদাদ, ওয়াসিত, নিনেভেহ, বসরা, কিরকুক, কারবালা ও দিয়ালা প্রদেশে তাদের একাধিক ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। এতে অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন। বার্তা সংস্থা এএফপির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়, নিনেভেহ ও দিয়ালার হামলাগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে।
পিএমএফ এই হামলাকে “বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ সন্ত্রাসী আক্রমণ” উল্লেখ করে বলেছে, এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব ও দেশটির সরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর গুরুতর আঘাত।
উল্লেখ্য, পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস মূলত শিয়া মুসলিম মিলিশিয়াদের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকি সশস্ত্র বাহিনীর অংশ। এর অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
ইরাকের প্রেসিডেন্সিও পিএমএফ ঘাঁটিতে হামলার নিন্দা জানিয়ে একে দেশের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, হামলাগুলো ইরাক সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই পরিচালিত হয়েছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলার নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের “চরম লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেছে। তেহরানের অভিযোগ, এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বিস্তারের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কৌশলের অংশ। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, সম্ভাব্য যেকোনো বিপজ্জনক পরিণতির দায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের বহন করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব ও ইরানের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননের প্রক্সি সংঘাতের কারণে আরও তীব্র হয়েছে। যদিও ২০২৩ সালে দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে, সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় সেই উত্তেজনা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীও লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী জাহাজ এবং সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, সানার বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরুর সম্ভাবনার কথা দুই দিন আগেই উল্লেখ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সে সময় তিনি “খুবই ইতিবাচক আলোচনা” চলছে বলে মন্তব্য করলেও ইরান সরাসরি কোনো আলোচনা চলছে—এমন দাবি অস্বীকার করে।
এর আগে টানা ১৩ রাত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অস্ত্র ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা কমিয়ে আনতেই ওই অভিযান পরিচালিত হয়। জবাবে ইরান প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে জর্ডান ও ইরাকে চার মার্কিন সেনা নিহত হন।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও অবাধ নৌ চলাচলের বিষয়টি এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরোধের অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছায়।
সর্বশেষ এই হামলার সময়ই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন সফরে ছিলেন। সেখানে তিনি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যেও অংশ নেন।
