মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের আজমেরু এলাকায় একটি শিমুলগাছজুড়ে বাবুই পাখির অসংখ্য বাসা প্রকৃতিপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ-সংলগ্ন ওই গাছটি এখন বাবুই পাখির নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। নতুন বাসা নির্মাণ, ছানার জন্য প্রস্তুতি এবং পাখিদের নিরন্তর আনাগোনায় এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
মোকামবাজার-অফিসের বাজার সড়কসংলগ্ন বিস্তীর্ণ ধানখেতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলগাছটির প্রায় প্রতিটি ডালে ঝুলে আছে বাবুই পাখির বাসা। কিছু বাসা পুরোনো হয়ে ধূসর রং ধারণ করলেও অধিকাংশই নতুন। অনেকগুলোর নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, আবার কয়েকটি এখনো বোনা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাবুই পাখিগুলো ঠোঁটে করে ঘাস ও কচি পাতার আঁশ এনে দক্ষতার সঙ্গে বাসা বুনছে। কোনো পাখি নতুন বাসার ভেতর ঢুকে পরীক্ষা করছে, আবার কেউ বাসার সামনে বসে ডানা ঝাপটিয়ে ডাকছে। গাছজুড়ে পাখিদের কিচিরমিচির আর অবিরাম ওড়াউড়িতে পুরো পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। শিমুলগাছের পাশের একটি সুপারিগাছেও কয়েকটি বাসা তৈরি করেছে তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবুই পাখির বাসা প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময়কর নির্মাণশৈলীর উদাহরণ। বাসার ভেতরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, নিরাপদ প্রবেশপথ এবং ডিম রাখার জন্য আলাদা কুঠুরি থাকে। ঝোড়ো বাতাসে ভারসাম্য বজায় রাখতে অনেক সময় বাসার নিচের অংশে কাদামাটি বা গোবর ব্যবহার করে ওজনও বাড়ায় বাবুই। এ কারণেই পাখিটিকে অনেকেই ‘স্থপতি পাখি’ নামে অভিহিত করেন।
বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, একসময় গ্রামবাংলার বিভিন্ন স্থানে বাবুইয়ের বাসা সহজেই চোখে পড়ত। বর্তমানে সে দৃশ্য অনেকটাই বিরল। তবে পার্কসংলগ্ন এ এলাকায় অনুকূল পরিবেশ থাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাবুই পাখি আশ্রয় নিয়েছে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
প্রজনন মৌসুমে পুরুষ বাবুই তাল, খেজুর, ধান কিংবা ঘাসের কচি পাতার আঁশ সংগ্রহ করে বাসা নির্মাণ শুরু করে। বাসার অর্ধেক তৈরি হলে স্ত্রী বাবুই সেটি পর্যবেক্ষণ করে। নির্মাণশৈলী পছন্দ হলে তবেই সঙ্গী নির্বাচন করে এবং এরপর সম্পন্ন হয় বাসার বাকি অংশ।
সাধারণত একটি বাসা নির্মাণে বাবুই পাখির সাত থেকে দশ দিন সময় লাগে। স্ত্রী বাবুই সাধারণত তিনটি ডিম পাড়ে। ডিমে তা দেওয়া শুরু হলে পুরুষ বাবুই নতুন বাসা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ডিম ফুটতে সময় লাগে প্রায় ১০ থেকে ১৩ দিন এবং ১৫ থেকে ১৯ দিনের মধ্যে ছানাগুলো উড়তে শেখে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে একে একে বাবুই পাখিগুলো নিজেদের নীড়ে ফিরে আসে। বাতাসে দুলতে থাকা শত শত বাসা আর পাখিদের কোলাহলে শিমুলগাছটি যেন এক প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যে রূপ নেয়।
