বাংলাদেশসহ ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নতুন শুল্কের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দেশটির ২৫টি অঙ্গরাজ্য। মামলায় শুল্কনীতি বাতিল হলে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যা দেশের রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি অঙ্গরাজ্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিভিন্ন পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হয়। বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
মামলার নথিতে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলোর জোট ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে ‘খামখেয়ালি, অযৌক্তিক ও আইনের পরিপন্থী’ বলে উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিদ্যমান আইনি ক্ষমতার আওতায় থেকেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সে কারণেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো দেশ যদি এ ধরনের পণ্যের বাণিজ্য প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারে, তবে সেটি অযৌক্তিক এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় জাপান, ব্রাজিল ও তাইওয়ানসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপরও নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। মূলত জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছিল।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত মোট পণ্যের প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশের ওপর প্রযোজ্য, যা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে মামলায় দাবি করা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে প্রশাসন এই শুল্কনীতি চালিয়ে যেতে পারে না। নথিতে আরও বলা হয়, ইউএসটিআরের আরোপিত শুল্কের পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে তা সংস্থাটির ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুল বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবৈধ শুল্ক খেটে খাওয়া পরিবারগুলোর ওপর আরোপিত নতুন কর ছাড়া কিছু নয়।”
ওরেগনের অ্যাটর্নি জেনারেল ড্যান রেফিল্ড বলেন, “প্রতিটি ধাপে আইনি লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পরও ট্রাম্প প্রশাসন আবার কর্মজীবী পরিবার ও স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে।” তিনি আরও বলেন, “এই অবৈধ শুল্কের মূল্য বিদেশি সরকার নয়, আমাদেরই পরিশোধ করতে হচ্ছে।”
নতুন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে অসন্তোষ জানিয়েছে। ব্রাজিল ও জাপান পৃথকভাবে এই পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, এই শুল্ক “রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের অজুহাত।” বর্তমানে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, কোনো দেশ জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা নির্ধারণের স্পষ্ট মানদণ্ড এখনো পরিষ্কার নয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প প্রশাসন যে নতুন বাণিজ্যনীতি বাস্তবায়ন শুরু করে, সাম্প্রতিক এই শুল্ক আরোপ তারই অংশ। এর আগে ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক কর্মসূচির আওতায় আরোপিত বেশ কয়েকটি শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেয়। আদালতের ওই রায়ের পর অনেক প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা শুল্ক ফেরত দিতে বাধ্য হয় মার্কিন সরকার।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, শুল্ক আরোপের মাধ্যমে মার্কিন শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। তবে সুপ্রিম কোর্ট পূর্ববর্তী শুল্ক বাতিল করার পর সাময়িকভাবে সব ধরনের আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করা হয়েছিল, যার মেয়াদ গত জুলাইয়ে শেষ হয়েছে।
এদিকে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার অভিযোগে বর্তমানে ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ভবিষ্যতে আরও নতুন শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
