দেশে ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের প্রধান উৎস এখন আর শুধু ফসল চাষ নয়; বরং হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালনই তাদের জীবিকার সবচেয়ে বড় ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের বার্ষিক নিট আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে পশুপালন খাত থেকে।
‘ক্ষুদ্র ও বৃহৎ খাদ্য উৎপাদকদের আয় ও উৎপাদনশীলতা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এই জরিপটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে পরিচালনা করে বিবিএস। গত ডিসেম্বর মাসে তথ্য সংগ্রহের পর সম্প্রতি জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
জরিপে ধান, শাকসবজি ও ডালের মতো মৌসুমি ফসল, ফলমূলসহ স্থায়ী ফসল, বনজ সম্পদ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন এবং মৎস্য চাষ—এই পাঁচটি কৃষি খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেশের আটটি বিভাগের ১২ হাজার ৮৭৯টি পরিবারের তথ্যের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক খামারের তথ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট খাদ্য উৎপাদকদের প্রায় ৫৪ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। তবে আয়ের দিক থেকে তারা বড় কৃষকদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। একজন ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক গড় নিট আয় ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা, যেখানে একজন বড় কৃষকের গড় আয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। অর্থাৎ বড় কৃষকদের তুলনায় ক্ষুদ্র কৃষকদের আয় প্রায় চার গুণ কম।
বিবিএসের তথ্য বলছে, ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে গড়ে ২৮ হাজার ৪২১ টাকা আয় হয় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন থেকে। যা তাদের মোট বার্ষিক নিট আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, অস্থায়ী ফসল যেমন ধান, গম বা শাকসবজি চাষ থেকে বছরে গড়ে আয় হয় ৪ হাজার ৫৯১ টাকা। আর ফলমূল বা দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ফসল থেকে গড় আয় মাত্র ২ হাজার ৩৩১ টাকা।
তবে মাছ চাষ ও বনজ সম্পদের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র কৃষকদের আয় তুলনামূলক বেশি। মাছ চাষ থেকে বছরে গড়ে ১২ হাজার ৬৭০ টাকা এবং বনজ সম্পদ থেকে ১০ হাজার ৮৯২ টাকা আয় করেন তারা।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষুদ্র কৃষকের জমির পরিমাণ খুবই সীমিত, আবার অনেকের নিজস্ব জমিই নেই। বর্গা বা লিজ নিয়ে চাষাবাদ করতে গিয়ে বীজ, সার, সেচ ও কীটনাশকের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ফসল উৎপাদন থেকে লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ফলে স্বল্প পরিসরে পশুপালন তাদের জন্য তুলনামূলক লাভজনক বিকল্প হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, অল্প পুঁজি ও বাড়ির আঙিনাতেই হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন করা সম্ভব। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোরবানির সময় দেশীয় গরু-ছাগলের চাহিদা বাড়ায় এ খাতে লাভের সুযোগও বেড়েছে। পাশাপাশি ডিম ও মুরগি বিক্রিও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য লাভজনক হয়ে উঠেছে।
তবে পশুপালন খাতে সম্ভাবনার পাশাপাশি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ ইউনুস। তার ভাষ্য, গবাদিপশুর খাদ্যের উচ্চ মূল্য এবং প্রান্তিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসা সেবার অভাব ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বড় বাধা। এ পরিস্থিতিতে সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ, পশুখাদ্যের দাম কমানো এবং গ্রাম পর্যায়ে আধুনিক পশুচিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলে ক্ষুদ্র কৃষকদের আয় ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
